হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া একটি উপকূলীয় দ্বীপ। দ্বীপের জন্ম ইতিহাসে জানা যায়, বিগত চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠে এটি। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে দ্বীপে মানুষের বসতি ও পদচারণা শুরু হয়। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে দ্বীপটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রবন অঞ্চল।
কুতুবদিয়া শুধু বাংলাদেশের একটি দ্বীপ নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় বাস্তবতার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সমুদ্র, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এখানকার বসিন্দারা। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই ম্যানগ্রোভ বন কুতুবদিয়াবাসীর জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ বা ঢাল।
এতে উপকূলের ওই ম্যানগ্রোভ বন সমুদ্র ও মানুষের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর তৈরী করছে। এর শেকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে উপকূলভাঙন কমায়, ঢেউয়ের শক্তি হ্রাস করে, মঠি ক্ষয়রোধ করে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সুরক্ষা দেয়। একসময় কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে ম্যানগ্রোভ বন ছিল। দ্বীপে কয়েক দশক আগেও অন্তত ১ হাজার ২০০ একর ম্যানগ্রোভ ছিল।
১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপের সুরক্ষাপ্রাচীর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল ম্যানগ্রোভ বনকে। কিন্তু গত তিন দশকে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়েছে ওই সুরক্ষাপ্রাচীর। ওই সময়ে ৯০০ একর ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হয়েছে লবণ মাঠ তৈরির জন্য। বর্তমানে টিকে থাকা বাকি ২০০ একর ম্যানগ্রোভও হুমকিতে পড়েছে আগ্রাসী লবণ চাষের কারণে।
কুতুবদিয়া উপকূল ঘুরে দেখা যায়, আলী আকবর ডেইল ইউপি’র আনিচের ডেইল, বড়ঘোপ ইউপি’র অমজাখালী, আজম কলোনী, লেমশীখালী ইউপি’র গাইনেকাটা ও উত্তর ধুরুং ইউপি’র আকবরবলী ঘাট এলাকাজুড়ে সর্বশেষ মে ২০২৫ সালের স্যাটেলাইট জরিপে মোট ২০০ একরের ম্যানগ্রোভ দৃশ্যমান। ম্যানগ্রোভ বন উপকূল সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কুতুবদিয়ায় দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।
ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, লবণ চাষের বিস্তার, জলবায়ু বৈরিতা, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে দিন দিন ম্যানগ্রোভের পরিমাণ কমেছে বলে জানান কুতুবদিয়া বন দপ্তরের কর্মকর্তা আবদু রাজ্জাক। এতে এই অঞ্চলের পরিবেশগত সংকটসহ উপকূলের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত দ্বীপবাসী।
সরেজমিনে, দ্বীপের মানগ্রোভ বনে গেওয়া, কেওড়া ও বাইন প্রজাতির গাছের দেখা মিললেও অন্যান্য প্রজাতি গুলো বিলুপ্ত। কুতুবদিয়া বন দপ্তরের কর্মকর্তা আবদু রাজ্জাকের মতে, নতুন করে ২০০ একর ম্যানগ্রোভ সৃজনের চাহিদাপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
ম্যানগ্রোভ উপকূল রক্ষাকবচ উল্লেখ করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজারের জেলা সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজলুল কাদের চৌধুরী জাজবাত ২৪ বাংলাকে বলেন, কুতুবদিয়ার ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণে দ্বীপের বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এরপর ভাঙা বেড়িবাঁধ সংস্কারের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও দুর্নীতির কারণে টেকসই বাঁধ হচ্ছে না। অন্যদিকে লবণের লোভে লোকজন ম্যানগ্রোভ বনের দিকে হামলে পড়ছে।
দ্বীপের পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন মহলের দাবি, দ্বীপের সুরক্ষাকবচ ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরী। এতে কুতুবদিয়ার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধারগুলো সুরক্ষিত থাকবে। সেইসাথে ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। ম্যানগ্রোভ বাঁচলেই বাঁচবে আমাদের উপকূল।