একাত্তরের বাহান্ন কিংবা আজকের পঁচিশ, সময়ের ক্যানভাসে ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, ইতিহাস তার পৃষ্ঠা উল্টে চলে। কিন্তু কিছু কিছু প্রহর ঘড়ির কাঁটার নিয়মে মরে না। তারা রক্তে লেপটে থাকে, স্মৃতির গভীরে কুরে কুরে খায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগের সেই মঙ্গলবারটা ছিল তেমনই এক প্রহর। সেদিন শুধু নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটনের জোড়া আকাশচুম্বী টাওয়ার বা পেন্টাগন কেঁপে ওঠেনি, কেঁপে উঠেছিল আধুনিক সভ্যতার অহঙ্কার, বিশ্বমানবতার বিবেক আর কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন। পঁচিশ বছর পেরিয়ে এসেও সেই ক্ষত আজও দগদগে, সেই ধোঁয়া আজও মানুষের চোখ ঝাপসা করে দেয়।
সেদিনের সকালটা ছিল আর দশটা সাধারণ শরতের সকালের মতোই স্নিগ্ধ। নিউ ইয়র্কের আকাশে তখন সবেমাত্র সোনালি রোদের ঝিলিক। মানুষ তাদের প্রতিদিনের চাকা সচল করতে ছুটছিল মেট্রোয়, বাসে কিংবা অফিসমুখী লিফটে। কেউ জানত না, কপোতছানার মতো শান্ত আকাশটাকে চিরতরে রক্তাক্ত করতে কিছু মানুষ আত্মঘাতী উন্মাদনা নিয়ে ওত পেতে আছে। একে একে হাইজ্যাক করা হল আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানগুলো নিমেষে পরিণত হল জীবন্ত কামানে।
প্রথমে হুড়মুড় করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানল একটি বিমান। তার কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় বিমানটি আছড়ে পড়ল দক্ষিণ টাওয়ারে। চোখের পলকে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করল কাচ আর স্টিলের তৈরি সুউচ্চ সৌধগুলোকে। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর বুক থেকে যেন অক্সিজেন হারিয়ে গিয়েছিল। জীবন্ত মানুষগুলো জানত না কোথায় পালাবে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান তখন মাত্র কয়েকটি তলার সিঁড়ি কিংবা একটা জানলা। বাঁচতে না পেরে শত শত মানুষ যখন ওপরের তলা থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, তখন তা ছিল মানুষের অসহায়ত্বের চূড়ান্ত বিলাপ।
টেলিভিশনের পর্দায় সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে দেখল সেই অপার্থিব ধ্বংসলীলা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের সামনে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল ১০০ তলার বেশি উঁচু দুটি মিনার। ম্যানহ্যাটনের আকাশ ঢেকে গেল ধ্বংসের ধোঁয়া আর ছাইয়ের ঘুটঘুটে অন্ধকারে। সেই ছাই ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন্ত স্বপ্ন, হাসি, কান্না আর ভালবাসার অবশেষ। কোনও কোনও অফিসকর্মী মৃত্যুর ঠিক আগে প্রিয়জনের মোবাইলে যে শেষ ভয়েস নোটটি রেখে গিয়েছিলেন— “মা, আমি হয়ত আর ফিরছি না, আমার ভালবাসাটুকু রেখো”, সেই আর্তনাদ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। পঁচিশ বছর পরেও কানে বাজে সেই কান্নার ধ্বনি।
৯/১১ শুধুমাত্র আমেরিকার ওপর আঘাত ছিল না, এটি ছিল সারা পৃথিবীর মানুষের এক যৌথ ট্র্যাজেডি। সেদিন টুইন টাওয়ারে যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তারা কেউ শুধু মার্কিন নাগরিক ছিলেন না, তারা ছিলেন বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ। সেখানে ছিলেন বাঙালিরাও, ছিলেন বহু অভিবাসী যারা বহু স্বপ্ন বুকে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন। একটিমাত্র সকালে নিভে গিয়েছিল প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি তাজা প্রাণ। ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল অগণিত পরিবার। এরপর কেটে গেছে আড়াই দশক। নিউ ইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে আজ তৈরি হয়েছে শান্ত জলের দুটি স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে খোদাই করা রয়েছে প্রতিটি মৃত মানুষের নাম। মানুষ সেখানে ফুল দেয়, জল ছিটায়, কিন্তু বুকফাটা কান্নাগুলো কি আর মোছে?
এই পঁচিশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। ৯/১১-র পর বদলে গেছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ, নিরাপত্তার চাদর, সীমান্ত পেরোনোর নিয়মকানুন। ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’ নামের এক অন্তহীন খেলায় রক্তে ভেসেছে আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মাটি। এক আতঙ্ক সারা পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। আজও মানুষ বিমানে ওঠার আগে এক অজানা শিহরণ অনুভব করে, আজও কোনও উড়োজাহাজের বিকট শব্দ শুনলে বুক কেঁপে ওঠে। মানুষ সন্দেহ করতে শিখেছে মানুষকে, দেওয়াল তুলেছে বিশ্বাসের বুকে। কিন্তু পঁচিশ বছর আগের সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমাদের কি সত্যিই কোনও শিক্ষা হয়েছে? নাকি আমরা কেবল ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুনকেই উসকে দিয়েছি বারবার?
আজ যখন আমরা পেছনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অবুঝ শিশুটির মুখ, যে বাবাকে হারিয়েছিল সেদিন সকালে; ভেসে ওঠে সেই মায়ের মুখ, যিনি আজও দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন ছেলের ফেরার অপেক্ষায়। ৯/১১ কোনও দূর অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমানের বুকে খোদাই করা এক দগদগে ঘা। যত দিন এই পৃথিবী থাকবে, যত দিন মানুষের বুকে থাকবে ভালবাসার টান, তত দিন এই পঁচিশ বছরের ক্ষত আমাদের মনে করিয়ে দেবে, হিংসা কখনও কোনও সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বুলেট বা বোমার আঘাতে হয়ত কিছু মানুষকে শেষ করে দেওয়া যায়, কিন্তু মানুষের আত্মাকে, বেঁচে থাকার আকুলতাকে ধ্বংস করা যায় না। প্রার্থনা শুধু একটাই, বিশ্বের প্রতিটা প্রান্তর থেকে মুছে যাক সব সন্ত্রাসবাদের কালো ছায়া। আর কোনও মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়। জোড়া টাওয়ারের ছাই থেকে জন্ম নিক এক নতুন পৃথিবী, যেখানে শুধু শান্তি আর মানবতার জয়গান বাজবে।