প্যারিস: বিশ্বজোড়া পর্যটকের অন্যতম আকর্ষণ আইফেল টাওয়ার। সেই আইফেল টাওয়ারই এ বার বন্ধ হয়ে গেল কর্মীদের বিক্ষোভে। আর বিতর্কের কেন্দ্রে একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের সফর। অভিযোগ, BAPS-এর একটি প্রতিনিধি দলের ব্যক্তিগত সফরের সময় টাওয়ারের মহিলা কর্মীদের তাঁদের নির্দিষ্ট কাজের জায়গা থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল। তাঁদের বদলে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্বে রাখার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়ায়, শুরু হয় প্রতিবাদ। শেষ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য বন্ধ রাখতে হয় আইফেল টাওয়ার। ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে প্যারিস প্রশাসন।
অভিযোগটি ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে Bochasanwasi Akshar Purushottam Swaminarayan Sanstha (BAPS)। প্রায় ১০০ জনের একটি প্রতিনিধি দল আইফেল টাওয়ারে গিয়েছিল। কর্মীদের অভিযোগ, ওই সফরের সময় মহিলা কর্মীদের এমন জায়গায় থাকতে বলা হয়েছিল যাতে তাঁদের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সামনে পড়তে না হয়। অভিযোগ আরও গুরুতর হয় যখন বলা হয়, মহিলা কর্মীদের জায়গায় পুরুষ সহকর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের মধ্যে। কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, কর্মক্ষেত্রে কোনও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণ দেখিয়ে মহিলাদের আড়ালে সরিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবাদে কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেন। তার জেরেই আইফেল টাওয়ারের পরিষেবা ব্যাহত হয় এবং পর্যটকদের জন্য স্মৃতিসৌধটি বন্ধ রাখতে হয়। বিতর্কে ঢুকে পড়েছে ফরাসি রাজনীতিও। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। ফরাসি রাজনৈতিক মহলের একাধিক ব্যক্তিও প্রশ্ন তুলেছেন, ফ্রান্সের মতো দেশে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার নীতি মেনে চলার পরেও এমন ঘটনা কী ভাবে ঘটতে পারে।
তবে ঘটনার অন্য একটি দিকও রয়েছে। BAPS সরাসরি মহিলা কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনের বক্তব্য, তাদের সফরটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং স্বাভাবিক দর্শনার্থীদের সময়ের মধ্যেই তা আয়োজন করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, কোনও ব্যক্তিকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিতর্কের জেরে যে অস্বস্তি বা কষ্ট তৈরি হয়েছে, তার জন্য BAPS দুঃখপ্রকাশ করেছে।
অন্য দিকে, ঘটনাটির তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী সংস্থা SETE-এর ভূমিকা। অভিযোগ অনুযায়ী, BAPS প্রতিনিধি দলের সফরের সময় মহিলা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা তাঁদের উপস্থিতি সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল এবং সেই অনুরোধ গ্রহণ করাই ভুল হয়েছে বলে সংস্থার তরফে স্বীকারোক্তি এসেছে। তবে ঠিক কে কী নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেই নির্দেশ কী ভাবে কার্যকর হয়েছিল, তা এখনও তদন্তাধীন।
ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এর ঠিক আগেই ফ্রান্সে BAPS-এর নতুন মন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক এবং হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই আবহে আইফেল টাওয়ারের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং কর্মক্ষেত্রে সমতার নীতি—দুইয়ের সীমারেখা কোথায়?
মহিলা কর্মীদের ঠিক কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই নির্দেশ BAPS দিয়েছিল কি না, নাকি স্থানীয় ব্যবস্থাপনার কোনও সিদ্ধান্ত থেকে পরিস্থিতির সৃষ্টি—তদন্তে তারই উত্তর খোঁজা হচ্ছে। BAPS-এর পক্ষ থেকে ‘কাউকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি’ দাবি করায় বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট- প্যারিসের আকাশে প্রতিদিন আলো জ্বালানো আইফেল টাওয়ারের নীচে এ বার আলোচনার কেন্দ্রে ধর্ম নয়, নারী-পুরুষের সমতা এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নেমেছে প্যারিস প্রশাসন।