নয়াদিল্লি: বাইরে থেকে দেখতে পনির। কাটলেও পনির। রান্না করলেও পনিরের মতোই। কিন্তু দুধ কোথায়? অনেক ক্ষেত্রে নেই। দুধের বদলে সয়াবিনের পেস্ট, উদ্ভিজ্জ তেল, পাম অয়েল, স্টার্চ কিংবা অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘অ্যানালগ’ বা সিন্থেটিক পনির। তার পর সেই পনিরই গাড়িতে চেপে পৌঁছে যাচ্ছে দিল্লি-এনসিআরের বাজার, ক্যাটারিং সংস্থা, ক্লাউড কিচেন, রেস্তরাঁ এবং বিয়েবাড়ির রান্নাঘরে।
দাম কম। সংরক্ষণ করা সহজ। উৎপাদনও দ্রুত। ফলে আসল দুধের পনিরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার প্রশ্নই নেই—বরং অনেক কম দামে বাজার দখল করছে এই ‘নকলের নকল’ পনির। নুহের গন্ডোলা গ্রামকে ঘিরে এমন একাধিক কারখানার সন্ধান মিলেছে । ওই অঞ্চলের কয়েকটি কারখানা থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১০ থেকে ১২ হাজার কেজি সিন্থেটিক পনির দিল্লি-এনসিআরে পাঠানো হয়।
৩৪০ টাকার পনির, ১২০-১৫০ টাকায় ‘বিকল্প’
ব্যবসার অঙ্কটাই এই কারবারের আসল চালিকাশক্তি। এক কেজি ফুল-ক্রিম পনির যেখানে বাণিজ্যিক ক্রেতার কাছে প্রায় ৩৪০ টাকা পড়তে পারে, সেখানে সবচেয়ে সস্তা সিন্থেটিক পনির পাওয়া যায় প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। ফলে ১,০০০ কেজির কোনও বড় ক্যাটারিং অর্ডারে প্রায় ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।
এই বিপুল ব্যবধানই ব্যবসায়ীদের কাছে লোভনীয়। গন্ডোলা-সহ নুহ এলাকার কয়েকটি জায়গা থেকে ভোরের দিকে গাড়ি বেরোয়। গন্তব্য দিল্লি, গুরুগ্রাম এবং আশপাশের বাজার। খাঁদসা মান্ডি, গুরুগ্রামের সবজি মান্ডি, গুরদ্বারা রোড, আনাজ মান্ডি এবং দিল্লির জনকপুরী, উত্তম নগর-সহ বিভিন্ন জায়গায় এই পনির পৌঁছয়। সেখান থেকে তার গন্তব্য বিয়েবাড়ি, ক্যাটারিং ব্যবসা, ক্লাউড কিচেন কিংবা স্থানীয় দুগ্ধপণ্য বিক্রির দোকান।
নিষেধাজ্ঞা, তবু থামেনি কারখানা
বিষয়টি আরও গুরুতর হয়েছে কারণ হরিয়ানা সরকার ইতিমধ্যেই অ্যানালগ বা নন-ডেয়ারি পনিরের উপর এক বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। খাদ্য সুরক্ষা আইনের অধীনে এই নিষেধাজ্ঞায় দুধের গুঁড়ো কিংবা উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করে এই ধরনের পনির তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মজুত উদ্ধার এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও রয়েছে। মহারাষ্ট্র, ছত্তীসগঢ় এবং গুজরাতেও সিন্থেটিক পনিরের বিরুদ্ধে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পরেও গন্ডোলা ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারখানার দরজা বন্ধ, বাইরে নজরদারি—তবু ভিতরে উৎপাদন চলার অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকদের অভিযান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারবারিরাও আরও গোপনে কাজ করছে বলে জানা গিয়েছে।
পনির সাদা করতে চুন!
তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক অভিযানে পুনহানা এলাকার কয়েকটি পনির তৈরির কারখানায় সাদা করার জন্য চুন বা slaked lime পাওয়া গিয়েছে বলে খাদ্য দফতরের এক সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ শুধু দুধের বিকল্প উপাদান ব্যবহারই নয়, পনিরকে দেখতে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতেও নানা কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
নুহের গন্ডোলা ছাড়াও কাটপুরী, পুনহানা শহর, পিনাংওয়ানের বড় বাজিদপুর, ফিরোজপুর ঝিরকার রানিয়ালা ও বোদি কোঠি এবং নাগিনার শেখপুরের মতো এলাকাতেও এই ধরনের উৎপাদনকেন্দ্র ছড়িয়েছে বলে খবর।
২৮৫ নমুনায় ২০০-ই মানের বাইরে!
শুধু কারখানার সন্ধানই নয়, সরকারি পরীক্ষার ফলও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত হরিয়ানায় পরীক্ষা করা ২৮৫টি পনিরের নমুনার মধ্যে ২০০টি নির্ধারিত মান পূরণ করেনি। পরীক্ষায় কয়েকটি নমুনায় বাটাইরোরিফ্র্যাক্টোমিটার রিডিং এবং আয়োডিনের মান নির্ধারিত সীমার বাইরে পাওয়া যায়। এতে প্রাকৃতিক দুধের চর্বির বদলে নন-মিল্ক ভেজিটেবল ফ্যাট ব্যবহারের ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ভারতে অ্যানালগ পনির তৈরি বা বিক্রি সব ক্ষেত্রেই বেআইনি নয়, যদি সেটি সঠিক ভাবে লেবেল করা থাকে এবং খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মেনে তৈরি হয়। সমস্যা তৈরি হচ্ছে যখন এমন পণ্যকে আসল দুধের পনির হিসাবে বিক্রি করা হচ্ছে বা উপাদানের তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে।
রেস্তরাঁয় কী ভাবে চিনবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ক্রেতার পক্ষে শুধু চোখে দেখে সব সময় আসল ও অ্যানালগ পনিরের তফাত বোঝা সম্ভব নয়। তবে কিছু লক্ষণ খেয়াল করা যায়।
ভাল, তাজা দুধের পনির সাধারণত নরম, খানিকটা দানাদার এবং সহজে ভেঙে যায়। অন্য দিকে কিছু অ্যানালগ পনির অস্বাভাবিক ভাবে মসৃণ, শক্ত বা রবারের মতো টানটান হতে পারে। স্বাদেও দুধের স্বাভাবিক গন্ধের বদলে প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো অনুভূতি থাকতে পারে।
তবে এখানেও সাবধানতা জরুরি। রান্নাবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি কিছু অ্যানালগ পনির এতটাই নিখুঁত হতে পারে যে শুধু স্বাদ, গন্ধ বা চেহারা দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। লেবেল দেখা এবং প্রয়োজনে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করাই নির্ভরযোগ্য উপায়।
‘পনির’ খাবেন, না শুধু নামটাই?
পুষ্টিবিদদের উদ্বেগ এখানেই। আসল পনির নিরামিষভোজীদের জন্য প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু উদ্ভিজ্জ তেল, পাম অয়েল, স্টার্চ, ইমালসিফায়ার বা সয়াবিনের পেস্ট-নির্ভর অ্যানালগ পনিরে সেই পুষ্টিগুণ একই নাও হতে পারে। কিছু পণ্যে প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম কম, অথচ স্যাচুরেটেড ফ্যাট, পরিশোধিত স্টার্চ, ক্যালরি বা সোডিয়াম বেশি হতে পারে।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে নিয়মিত এমন খাবার খাওয়ানো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বেশি। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট নিয়মিত গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, এলডিএল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট অ্যানালগ পনির খেলেই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
রেস্তরাঁয় নাম লিখতে হবে ‘অ্যানালগ’
এই পরিস্থিতিতে অনলাইন খাবার সরবরাহকারী সংস্থাগুলিও নজরদারি বাড়াচ্ছে। ৩১ অগস্ট Zomato অ্যানালগ খাবারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। রেস্তরাঁগুলিকে প্রাকৃতিক দুগ্ধজাত উপাদানে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি, তা সম্ভব না হলে অ্যানালগ পণ্য সরিয়ে নেওয়া এবং উপাদানের তালিকা ও লেবেল ঠিক ভাবে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
নুহ প্রশাসনের তরফেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৩টি পনির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নুহের ডেপুটি কমিশনার। তার মধ্যে তিনটি ইউনিট ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছে, আরও পাঁচটির বিরুদ্ধে বন্ধের নির্দেশ জারি হয়েছে, চারটি শো-কজের মুখে এবং একটি ইউনিটের বিরুদ্ধে বন্ধের সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
শেষ প্রশ্নটা তাই ক্রেতার জন্য, থালায় যে পনির এল, সেটি সত্যিই দুধের তৈরি তো? উত্তরটি না-ও হতে পারে। আর দামের লোভে সেই তফাতটুকু আড়াল হয়ে গেলে ‘পনির’ শুধু খাবার থাকে না, হয়ে ওঠে খাদ্য-নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন।