ওয়াশিংটন: নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার তখনও তিন বছর বাকি। বিশ্বজুড়ে আল কায়দার জাল কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, সে সম্পর্কে আমেরিকার গোয়েন্দা মহলে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছিল উদ্বেগ। আর সেই সময়েই উঠে এসেছিল ভারতের নাম। আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন একাধিক দেশে হামলার পরিকল্পনা করছেন—১৯৯৮ সালের একটি মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে এমনই সতর্কবার্তা ছিল। সেই সম্ভাব্য লক্ষ্যদেশগুলির তালিকায় ছিল ভারতও।
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তির আবহে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা CIA-র প্রকাশ করা একগুচ্ছ গোপন নথিতে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুক্রবার প্রকাশ করা হয়েছে বিন লাদেন ও আল কায়দা সংক্রান্ত ৭০টিরও বেশি প্রেসিডেনশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্রিফ। শতাধিক পাতার সেই নথিপত্রে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে আমেরিকার শীর্ষ নেতৃত্বকে দেওয়া একের পর এক সতর্কবার্তার ছবি ফুটে উঠেছে।
তালিকায় ভারত, পাকিস্তানও
CIA-র ১৯৯৮ সালের একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, বিন লাদেন একাধিক দেশে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন। সেই তালিকায় ছিল মিশর, আরব উপদ্বীপের কয়েকটি দেশ—বিশেষ করে কুয়েত, সৌদি আরব ও ইয়েমেন—পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, উগান্ডা এবং সম্ভবত নাইজেরিয়াও।
তবে নথিতে ভারতের কোনও নির্দিষ্ট শহর, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নাম উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ ভারতকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল—কিন্তু কোথায় বা কী ভাবে হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল, তার নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত নথিতে নেই।
এই তথ্যের গুরুত্ব এখানেই যে, ১৯৯৮ সালেই আল কায়দার আন্তর্জাতিক হামলার পরিধি নিয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী তিন বছরে সেই আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে ভয়াবহ হামলা চালায় আল কায়দা।
তখনও লক্ষ্য শুধু আমেরিকা নয়
নতুন করে প্রকাশিত নথিগুলি থেকে যে ছবিটি পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বিন লাদেনের সন্ত্রাসী পরিকল্পনা শুরু থেকেই শুধু আমেরিকাকে কেন্দ্র করে ছিল না। বিভিন্ন দেশে আল কায়দার নেটওয়ার্ক, সম্ভাব্য হামলা এবং সংগঠনের সক্ষমতা নিয়ে CIA নিয়মিত প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট পাঠাচ্ছিল।
১৯৯৮ সালের একটি নথিতে বিন লাদেনের অবস্থান এবং তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত গোয়েন্দা মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সেখানে আমেরিকার পাশাপাশি অন্য দেশগুলিতেও হামলার সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। অর্থাৎ ৯/১১ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া এক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী পরিকল্পনার চূড়ান্ত ও ভয়াবহ প্রকাশ—নতুন নথিগুলি সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও স্পষ্ট করছে।
হাইজ্যাক করে বিমান, ছিল আরও ভয়ঙ্কর আশঙ্কা
শুধু ভারত বা অন্য দেশে হামলার পরিকল্পনার কথাই নয়, ৯/১১-এর বহু আগে CIA-র কাছে আল কায়দার বিমান ছিনতাইয়ের সম্ভাবনাও উঠে এসেছিল।
১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের একাধিক প্রেসিডেনশিয়াল ব্রিফে বিমান ছিনতাইয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। এমনকি বিস্ফোরক বোঝাই বিমান ব্যবহার করে আমেরিকার কোনও শহরে হামলার সম্ভাবনাও গোয়েন্দা মূল্যায়নে বিবেচনা করা হয়েছিল। ফলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যে পদ্ধতিতে হামলা হয়েছিল, তার কিছু সম্ভাব্য রূপ আমেরিকার গোয়েন্দা মহলের চিন্তায় তার আগেই এসেছিল।
কেন থামানো গেল না ৯/১১?
নতুন নথি প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে—যদি এত আগে সতর্কবার্তা ছিল, তা হলে ৯/১১ আটকানো গেল না কেন?
নথিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বিন লাদেনের গতিবিধি, আল কায়দার নেটওয়ার্ক এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই তথ্যের অনেকটাই ছিল সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে। নির্দিষ্ট তারিখ, নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা হামলার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে গোয়েন্দাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না।
ফলে সতর্কবার্তা থাকলেও সেই তথ্যকে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করা যায়নি। ৯/১১ কমিশনের পরবর্তী মূল্যায়নেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান ও সমন্বয়ের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
আগেই জানতেন ক্লিন্টন, পরে সতর্ক করা হয় বুশকেও
প্রকাশিত নথিগুলির একটি বড় অংশ প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সময়কার। অর্থাৎ ৯/১১-এর বহু আগে থেকেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বিন লাদেনের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছচ্ছিল।
বিশেষ করে ২০০১ সালের ৬ অগস্টের প্রেসিডেনশিয়াল ডেইলি ব্রিফে বিন লাদেনের আমেরিকার ভিতরে হামলা চালানোর দৃঢ় ইচ্ছার কথা উল্লেখ ছিল। এই নথিটি আগে থেকেই প্রকাশ্যে এসেছিল। নতুন করে প্রকাশিত নথিগুলি সেই সতর্কবার্তার পিছনে থাকা দীর্ঘ গোয়েন্দা মূল্যায়নের ধারাটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তালিকায় পাকিস্তানও, কিন্তু অন্য প্রশ্নও উঠছে
চাঞ্চল্যের আরও একটি কারণ পাকিস্তানের নাম। ভারত এবং পাকিস্তান—দুই দেশকেই সম্ভাব্য হামলার তালিকায় রাখা হয়েছিল বলে ১৯৯৮ সালের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরে ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে মার্কিন অভিযানে বিন লাদেনের সন্ধান মেলে। আমেরিকার দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে তার পরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে সদ্য প্রকাশিত ১৯৯৮ সালের নথিকে ব্যবহার করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে বিন লাদেনের কোনও নির্দিষ্ট যোগসাজশের দাবি করা যায় না। প্রকাশিত নথিতে এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। বরং পরবর্তী নথিগুলিতে তালিবানের সঙ্গে বিন লাদেনের সম্পর্ক এবং তাঁকে আফগানিস্তান থেকে বহিষ্কার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েও গোয়েন্দা মূল্যায়ন রয়েছে।
তালিবানও তখন বিন লাদেনকে ছাড়েনি
নথি থেকে জানা যাচ্ছে, আফগানিস্তানে বিন লাদেনের উপস্থিতি নিয়েও আমেরিকার উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছিল। ২০০০ সালের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, তালিবানের মন্ত্রিসভা আগের মাসে বিন লাদেনকে আফগানিস্তান থেকে বহিষ্কার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ ৯/১১-এর আগে বিন লাদেনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সন্ত্রাসের আশঙ্কা—সবই একসঙ্গে চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জাল ছিন্ন করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
২৫ বছর পর ফের সামনে সেই প্রশ্ন
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে আল কায়দার জঙ্গিরা। দুটি বিমান নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারের দুই ভবনে আঘাত হানে। আর একটি বিমান আঘাত করে পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ায় ভেঙে পড়ে। প্রায় ৩,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
তার ২৫ বছর পরে প্রকাশিত CIA-র এই নথিগুলি কোনও একক ‘নতুন ষড়যন্ত্র’ সামনে আনছে না। বরং যে প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ, গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের তাড়া করে ফিরেছে, সেটিই ফের সামনে আনছে—সতর্কবার্তা ছিল, আশঙ্কাও ছিল, বিন লাদেনের নামও জানা ছিল; তা হলে সেই সতর্কতার পরও কেন ঠেকানো গেল না ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা?
আর সেই পুরনো নথির পাতাতেই এখন নতুন করে চোখে পড়ছে ভারতের নাম—৯/১১-এর আগেই কি আল কায়দার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সম্ভাব্য মানচিত্রে ভারতকে রাখা হয়েছিল? CIA-র প্রকাশিত নথি অন্তত সেই আশঙ্কারই প্রমাণ দিচ্ছে।