নয়াদিল্লি: বিশ্ব রাজনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা আর শুধু নিয়ম মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা এবার বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম তৈরিতেও সক্রিয় ভূমিকা নেবে। নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে এমনই জোরালো বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারত মণ্ডপে আয়োজিত সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-সহ ব্রিকস সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রনেতাদের সামনে মোদী বলেন, গ্লোবাল সাউথকে ‘রুল-টেকার’ থেকে ‘রুল-শেপার’-এ পরিণত করতে হবে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বর্তমান বিশ্ব শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্যের বিষয়টিও।
মোদীর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর। অথচ আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন বলেই মত প্রধানমন্ত্রীর।
বিশ্ব শাসনব্যবস্থাকে একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় অংশ এখনও কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে যেসব দেশ সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করে, তাদের অনেক সময় সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত ভূমিকা থাকে না।
এই পরিস্থিতি বদলাতে আগামী দুই দশকের জন্য একটি নতুন কর্মপরিকল্পনার কথা বলেন মোদী। তাঁর প্রস্তাবিত ১০ দফা রূপরেখার মূল ভিত্তি—প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ম তৈরি। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা UNSC-র সংস্কার।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা দেশগুলির ভোটাধিকার এবং নীতিনির্ধারণে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও একাধিক প্রস্তাব দেন মোদী। নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় যাতে সংগঠনের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তার জন্য ‘ট্রয়োকা’ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে তাঁর রূপরেখায়। পাশাপাশি গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভান্ডার তৈরির কথাও বলেন তিনি।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব সামুদ্রিক বাণিজ্যেও পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস দেশগুলির নাবিকদের জরুরি সহায়তার জন্য ‘Seafarers' Emergency Support Network’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বিপদের সময়ে চিকিৎসা সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, সম্মেলনের প্রথম দিনেই সদস্য দেশগুলির মধ্যে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হওয়াকে ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রসঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম না করে আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকসের মঞ্চে মোদীর বক্তব্যে স্পষ্ট—বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে আরও বড় ভূমিকা দিতে হবে। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত সম্মেলন সেই দাবিকেই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরালোভাবে সামনে আনল।




