নয়াদিল্লি: ২৫ বছর। একজন রাজনীতিকের জীবনে এই সময়টা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ। এই সময়ের মধ্যে বদলেছে সরকার, বদলেছে বিরোধী শক্তি, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরে যাননি নরেন্দ্র মোদী। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক যাত্রার শুরু। ২৫ বছর পর সেই যাত্রা তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে পৌঁছে দিয়েছে।
২০০১ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৩ বছর রাজ্য পরিচালনা করেন মোদী। সেই সময় তাঁর প্রশাসনের অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে উন্নয়নকেন্দ্রিক মডেল। পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ, জল, শিল্প এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুজরাতের মডেলকে সামনে রেখে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। ধীরে ধীরে ‘গুজরাত মডেল’ হয়ে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
তবে মোদীর রাজনৈতিক যাত্রা কখনও বিতর্কমুক্ত ছিল না। ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় বিতর্কিত অধ্যায়। পরবর্তী সময়েও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সরকারি নীতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে তাঁর প্রশাসনের উন্নয়নমূলক কাজ নিয়েও প্রশংসা হয়েছে।
২০১৪ সালে গুজরাত থেকে দিল্লির রাজনীতিতে বড়সড় পালাবদল ঘটে। লোকসভা নির্বাচনে BJP-র বিপুল জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী। এরপর নোটবন্দি, GST, স্বচ্ছ ভারত অভিযান, জনধন যোজনা, ৩৭০ ধারা বিলোপ, UPI এবং আত্মনির্ভর ভারতের মতো একাধিক বড় সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর সরকার। প্রতিটি সিদ্ধান্তই জাতীয় রাজনীতিতে তৈরি করেছে ব্যাপক আলোচনা কোথাও প্রশংসা, কোথাও তীব্র সমালোচনা।
কৃষি আইন নিয়েও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন হয়। দীর্ঘ কৃষক আন্দোলনের পর ২০২১ সালে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করে কেন্দ্র। এই ঘটনাও মোদী সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনমতের চাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে।
এরপর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আরও শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে BJP। ২০২৪ সালের নির্বাচনে BJP একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও NDA ২৯৩টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে। তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী। একদিকে তাঁর সরকারের উন্নয়ন, পরিকাঠামো, ডিজিটাল পরিষেবা এবং বিভিন্ন সংস্কারকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতেও নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ‘বহিরাগত’ বনাম ‘বাংলার মাটি’ এই রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তপ্ত হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। তৃণমূলের ‘বহিরাগত’ আক্রমণের জবাবে মোদী বলেছিলেন, বাংলায় কোনও ভারতীয়ই বহিরাগত নন। ‘সোনার বাংলা’র প্রতিশ্রুতি নিয়ে BJP-র হয়ে বাংলায় ব্যাপক প্রচার চালান তিনি।
এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর BJP রাজ্যে সরকার গঠন করে। ফলে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠার পাশাপাশি বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলেও মোদীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসে।
২৫ বছরের এই প্রশাসনিক যাত্রায় নরেন্দ্র মোদীকে ঘিরে যেমন তৈরি হয়েছে উন্নয়ন ও সাফল্যের দাবি, তেমনই রয়েছে বিতর্ক, সমালোচনা এবং একাধিক কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সময় বদলেছে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, বিরোধী বদলেছে। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে মোদীর সম্পর্ক বদলায়নি। এখন নজর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথেও পড়তে পারে।
