কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে পালাবদলের পর বদলেছে শুধু সরকার নয়, বদলেছে রাজনৈতিক পরিচয়ের মানচিত্রও। যে নেতারা একদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ হয়ে জোড়াফুলের প্রতীকে ভোট চেয়েছিলেন, তাঁদেরই একাংশ আজ অন্য রাজনৈতিক শিবিরের অন্যতম মুখ। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই আনুগত্যের কেন্দ্রও যে কত দ্রুত সরে যেতে পারে, সোমবারের রাজ্যসভার মনোনয়ন পর্ব যেন সেই বাস্তবকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।
একসময়ের তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুস্মিতা দেব, সুখেন্দু শেখর রায় এবং প্রকাশ চিক বড়াইক এ দিন বিজেপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত থেকে গেরুয়া পতাকা তুলে নিয়েছিলেন তাঁরা। এ বার সেই দলই তাঁদের সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠাতে চলেছে। বিধানসভার বর্তমান সমীকরণে তাঁদের জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই ঘটনাকে নিছক দলবদল হিসেবে দেখছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। তাঁদের মতে, এটি আসলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বদলে যাওয়া বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নির্বাচনী পরাজয়ের পর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত একাধিক অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির, অন্যদিকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রায় ৬০ জনেরও বেশি বিধায়কের গোষ্ঠী, যারা নিজেদেরই 'আসল তৃণমূল' বলে দাবি করছে। আবার একাধিক প্রাক্তন সাংসদ ও নেতা নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা বেছে নিয়েছেন। ফলে একসময়ের অখণ্ড তৃণমূল এখন যেন ভাঙা আয়নার মতো— প্রতিটি অংশেই নিজেকে আসল বলার প্রতিযোগিতা।
সোমবার রাজ্যসভার মনোনয়ন সেই পরিবর্তনেরই রাজনৈতিক প্রতীক। কারণ, যাঁরা একদিন তৃণমূলের হয়ে সংসদে গিয়েছিলেন, তাঁরাই আজ বিজেপির ভরসার প্রার্থী। ঘটনাচক্রে এটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় যে, সরকার গঠনের পর বিজেপির তরফে প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছিল তৃণমূল থেকে কাউকে দলে নেওয়া হবে না। পরে অবশ্য অবস্থান বদলে বলা হয়, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নন— এমন নেতাদের জন্য দলের দরজা খোলা। সুস্মিতা, সুখেন্দু ও প্রকাশের রাজনৈতিক সফর সেই নীতিরই বাস্তব রূপ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু ক্ষমতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এর সামাজিক অভিঘাতও কম নয়। রাজনৈতিক আনুগত্যের এই দ্রুত পরিবর্তন সাধারণ মানুষের একাংশের মনে প্রশ্ন তুলছে— আদর্শ কি এখন আর রাজনীতির চালিকাশক্তি নয়? ভোটের আগে এক প্রতীকে মানুষের কাছে যাওয়া, আর ভোটের পর অন্য প্রতীকের হয়ে সাংবিধানিক পদে বসা— এই ধারাবাহিকতা রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই কি ক্রমশ ক্ষয় করছে? বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি কি আদর্শের লড়াই নয়, বরং ক্ষমতার সুবিধাজনক সমীকরণে পরিণত হচ্ছে?
রাজ্যসভার তিনটি মনোনয়ন তাই শুধু তিনটি নামের ঘোষণা নয়। তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে পাল্টে যাওয়া বাংলার রাজনীতির এক বড় ছবি— যেখানে বিরোধী শিবির ভাঙছে, নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরেই ঘুরছে রাজনৈতিক আনুগত্যের চাকা।