বর্ধমান, নিউজ ডেস্ক: পেশায় ছিলেন ওটি টেকনিশিয়ান। কিন্তু অভিযোগ, সেই পরিচয় বদলে গিয়ে কেউ হয়ে উঠেছিলেন চিকিৎসক। শুধু রোগী দেখাই নয়, ভুয়ো MBBS সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে দিনের পর দিন অস্ত্রোপচারও করার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে এমনই চাঞ্চল্যকর একটি ভুয়ো চিকিৎসক চক্রের অভিযোগ সামনে এসেছে। একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম সংগঠনের দাবি, এখনও পর্যন্ত এমন পাঁচজনের হদিস পাওয়া গিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোমের অভিযোগ, বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র দেখিয়ে ওই পাঁচজন MBBS-এর নথি তৈরি করেছিলেন। সেই নথির ভিত্তিতেই বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। আরও গুরুতর অভিযোগ, ওই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করে চিকিৎসা করার লাইসেন্স নিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিষয়টি কীভাবে সামনে এল, তা নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন জেলা পরিদর্শনের সময় তাঁদের কাছে একাধিক অভিযোগ আসতে শুরু করে। অভিযোগ ছিল, কয়েকজন ওটি টেকনিশিয়ান MBBS-এর সার্টিফিকেট নিয়ে চিকিৎসা করছেন। শুধু চিকিৎসা নয়, নিয়মিত অস্ত্রোপচারও করছেন তাঁরা। এরপর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দু’জনকে নিয়ে খোঁজখবর শুরু করা হয়।
রাজীব পাণ্ডের দাবি, ওই ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করতে বিহারের সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেখান থেকে জানানো হয়, ওই নামে কোনও ব্যক্তি সেখানে পড়াশোনা করেননি। এরপর বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলেও চিঠি পাঠানো হয়। সংগঠনের দাবি, কাউন্সিলের তরফেও জানানো হয়, ওই দুই ব্যক্তির নামে কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই। এরপরই তাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে অভিযোগ আরও জোরালো হয় বলে দাবি সংগঠনের।
সংগঠনের আরও অভিযোগ, অভিযুক্তদের মধ্যে একজন পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রায় ২৫-২৬টি নার্সিংহোমে নিয়মিত অস্ত্রোপচার করতেন। অন্য একজন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে একটি নার্সিংহোম চালানোর পাশাপাশি নিউ টাউনে একটি ডার্মা ক্লিনিকও পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ। একই ব্যক্তি কীভাবে গাইনি এবং ডার্মাটোলজি—দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা করতেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
রাজীব পাণ্ডে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই বিষয়টি স্বাস্থ্য দফতরের নজরে আনা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভুয়ো চিকিৎসকদের কারণে ভুল চিকিৎসা এবং মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত মেডিক্যাল নথি ও রেজিস্ট্রেশন খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংগঠনের সম্পাদক।
সংগঠনের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই ধরনের অনিয়ম ঘটেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর চিকিৎসা ব্যবস্থায় নথি যাচাই এবং চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পাঁচজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি। স্বাস্থ্য দফতরের তরফেও এই অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলি তদন্তে কতটা সত্য প্রমাণিত হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদৌ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর।