বর্ধমান: প্রকৃতি এ বার মুখ তুলে চেয়েছিল। আবহাওয়া ছিল অনুকূলে। আলুর ফলন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। মাঠ ভরেছে ফসলে। কিন্তু সেই প্রাচুর্যই যেন আজ অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাষিদের কাছে। কারণ, আলু আছে— ক্রেতা নেই। হিমঘর ভর্তি বস্তার পর বস্তা আলু, অথচ বাজারে দাম ক্রমশ তলানিতে।
রাজ্যের আলুচাষিদের একাংশের কথায়, এমন দামের পতন বহু বছর দেখা যায়নি। ৫০ কেজির একটি বন্ড, যা আলু ওঠার সময়ও প্রায় ৩০০ টাকায় হিমঘরে ঢুকেছিল, সেই বন্ডের বর্তমান বাজারদর নেমে এসেছে মাত্র ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, সংরক্ষণের ব্যয়ও ওঠার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে।
এই সংকটের আবহেই শুক্রবার পূর্ব বর্ধমানের কালনার কাঁকুড়িয়া গ্রামে আব্বাস শেখ (৬০) নামে এক আলুচাষির আত্মহত্যার ঘটনা কৃষিজীবী সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ এবং আলুর বাজারে ধসই তাঁকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
হিমঘরে আলু, কিন্তু আশার আলো নেই
চাষিদের একাংশ জানাচ্ছেন, এখনও প্রায় চার মাস হিমঘরে আলু রেখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে দাম বাড়বে— এমন আশা আর করছেন না অনেকেই। বরং তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তবে হিমঘর থেকে আলু বের করে বাজারে আনার খরচও হয়তো উঠবে না।
কালনার রানিবাঁধের চাষি সুমন মণ্ডল বলেন, “২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। প্রায় দু'হাজার প্যাকেট আলু এখনও হিমঘরে রয়েছে। বর্তমান বাজারদরে আমার লোকসান সাড়ে চার লক্ষ টাকার কাছাকাছি। ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। এখন সেই ঋণ শোধ করব কী করে?”
খরচ বাড়ছে, দাম কমছে
আলুচাষিদের অভিযোগ, গত এক বছরে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি— সব কিছুরই দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্যাকেজিংয়ে।
চাষি অজয় শীটের কথায়, “গত বছর যে বস্তা আট টাকায় কিনেছি, এ বছর সেই বস্তার দাম দিতে হয়েছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। সারের বস্তাও আড়াই হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এত খরচের পর যদি আলুর দামই না মেলে, তা হলে চাষ করব কীভাবে?”
চাষিদের হিসাব বলছে, এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে খরচ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অনেক ক্ষেত্রে বিঘাপিছু ১০০ থেকে ১২০ বস্তা পর্যন্ত ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারদর এতটাই কম যে সেই ফলনই এখন লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভিন রাজ্যের বাজার হারানোর অভিযোগ
আলুর বাজারে এই ধসের জন্য আগের সরকারের নীতিকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য কমিটির সদস্য আনন্দ সাঁতরার দাবি, কয়েক বছর ধরে ভিন রাজ্যে আলু পাঠানোর উপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় পশ্চিমবঙ্গ তার ঐতিহ্যগত বাজার হারিয়েছে।
তাঁর কথায়, “অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগড়ে আগে বাংলার আলু যেত। সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেই রাজ্যগুলি এখন নিজেরাই আলু উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়েছে। নতুন হিমঘরও তৈরি হয়েছে। ওডিশাও এখন উত্তরপ্রদেশ থেকে আলু নিচ্ছে। ফলে বাংলার আলুর চাহিদা আগের মতো নেই।”
সরকারি ভর্তুকির আশায় চাষিরা
সংকট কাটাতে হিমঘরে সংরক্ষিত আলুর উপর সরকারি ভর্তুকির দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ী ও কৃষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, সংরক্ষণ খরচে কিছুটা সহায়তা মিললে অন্তত তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমবে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য উপদেষ্টা বিভাস দে বলেন, “এ বছর শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশেই আলুর ভালো ফলন হয়েছে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে। রাজ্য বাজেটে বস্তাপিছু ২০০ টাকা ভর্তুকি এবং কৃষিতে বিদ্যুৎ খরচে ভর্তুকির ঘোষণা হয়েছে। সেগুলি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।”
ফসল আছে, হাসি নেই
চাষিরা বলছেন, ভালো ফলন সাধারণত আনন্দের খবর। কিন্তু বাজারে চাহিদা না থাকলে সেই ফলনই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঋণ, উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ খরচ এবং ভেঙে পড়া বাজার সব মিলিয়ে রাজ্যের আলুচাষিরা এখন কঠিন আর্থিক সংকটের মুখে।
মাঠে সোনালি ফসলের প্রাচুর্য থাকলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। বরং একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এ ভাবে চললে আগামী মরসুমে আলু চাষ করার সাহসই বা কত জনের থাকবে?