কলকাতা: বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ-খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল গোটা এলাকা, সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সিপিএম নেতা লাহেক আলিই শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে। রবিবার গভীর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে বারুইপুর জেলা পুলিশ। অভিযোগ, প্রতিবাদের আড়ালে আইনশৃঙ্খলা ভাঙতে উস্কানি, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, পুলিশের কাজে বাধা-সহ একাধিক গুরুতর অপরাধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সেই অভিযোগেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) বিভিন্ন আইনের মোট ২০টি ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গত কয়েক দিন ধরে বারুইপুরের সূর্যপুর কার্যত থমথমে। নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ সামনে আসতেই এলাকায় শুরু হয় প্রবল বিক্ষোভ। প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ হলেও, পরে সেই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। অভিযোগ, পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। রাস্তা অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, সরকারি গাড়িতে ভাঙচুর, ইটবৃষ্টি, টায়ারে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ— একাধিক ঘটনার সাক্ষী থাকে বারুইপুর।
তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখে লাহেক আলির বিরুদ্ধে একাধিক প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। পুলিশের অভিযোগ, তিনি শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না, উত্তেজিত জনতাকে আরও উস্কে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে সিপিএম।
পুলিশ সূত্রে খবর, লাহেক আলির বিরুদ্ধে হিংসা, বেআইনি জমায়েত, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, অগ্নিসংযোগ, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি নষ্ট প্রতিরোধ আইন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০টি ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেফতারের আশঙ্কায় আগেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন লাহেক আলি। তিনি গ্রেফতারি থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। কিন্তু আদালত জরুরি ভিত্তিতে সেই আবেদন শুনতে অস্বীকার করে নিয়ম মেনে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেয়। এরপরই পুলিশের তৎপরতা বাড়ে। রবিবার রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
অন্যদিকে, এই গ্রেফতারিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই দাবি করেছে সিপিএম। দলের বক্তব্য, নাবালিকার মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হওয়াতেই বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের সাজানো মামলায় লাহেক আলিকে ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছে বাম নেতৃত্ব। যদিও রাজ্য পুলিশের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তদন্তে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
বারুইপুর পশ্চিম কেন্দ্রের পরিচিত বাম মুখ লাহেক আলি চলতি বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএম প্রার্থী ছিলেন। ফলে তাঁর গ্রেফতারকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নাবালিকার মৃত্যুর তদন্তের পাশাপাশি বিক্ষোভ ঘিরে হিংসার ঘটনাতেও এখন সমান গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। আগামী দিনে এই মামলায় আরও গ্রেফতার হতে পারে বলেও তদন্তকারী মহলের ইঙ্গিত।