ভোটের আগে এসেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। সরকার গঠনের আড়াই মাস পরেও শিবির ওঠেনি। ফলে চার মাস ধরে কার্যত বন্ধ পঠনপাঠন। পরীক্ষা হয়নি, নিয়মিত ক্লাসও নয়। উদ্বিগ্ন অভিভাবক, শিক্ষক ও পড়ুয়ারা। প্রশাসনের আশ্বাস, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালদা: নির্বাচনের উত্তাপ অনেক আগেই থেমেছে। নতুন সরকারও দায়িত্ব নিয়েছে প্রায় আড়াই মাস আগে। কিন্তু ভোটের জন্য আসা কেন্দ্রীয় বাহিনী এখনও ডেরা গেড়ে রয়েছে স্কুলের মধ্যেই। আর সেই কারণেই গত চার মাস ধরে কার্যত স্তব্ধ হয়ে রয়েছে পঠনপাঠন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মালদার ইংরেজবাজারের শান্তা দেব্যা হাইস্কুলের প্রায় সাড়ে ৮০০ পড়ুয়া। স্কুলে ক্লাস নেই, নিয়মিত পরীক্ষা নেই, নেই স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে পড়ুয়া, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে।
ইংরেজবাজারের এই কো-এডুকেশন স্কুলে প্রায় সাড়ে আটশো ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং দু'জন প্যারা-টিচার। আশপাশের একাধিক গ্রামের পড়ুয়াদের কাছে এই স্কুলই উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা। অথচ ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে ওঠার পর থেকে আজও সেই বাহিনী সরানো হয়নি। ফলে স্কুল ভবনের অধিকাংশ অংশ প্রশাসনের দখলে থাকায় স্বাভাবিক ক্লাস চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটের আগে ১৪ এপ্রিল স্কুল বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর গরমের ছুটি কাটিয়ে ১ জুন স্কুল খুললেও ১৩ জুন ফের কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে এসে ওঠে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কার্যত বন্ধ রয়েছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। অন্য স্কুলে যেখানে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে, সেখানে শান্তা দেব্যা হাইস্কুলের পড়ুয়ারা এখনও নিয়মিত ক্লাসই করতে পারেনি।
জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ স্কুল
স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মনোজ মণ্ডল জানান, বিষয়টি একাধিকবার জেলা প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে। লিখিতভাবে জেলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং জেলাশাসকের কাছেও আবেদন জানানো হয়েছে।
তাঁর কথায়, “আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব স্কুলে স্বাভাবিক পঠনপাঠন শুরু হোক। প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।”
‘ছেলেমেয়েরা বই ছেড়ে কাজে চলে যাচ্ছে’
শুধু শিক্ষকরাই নন, ক্ষোভে ফুঁসছেন অভিভাবকেরাও। তাঁদের অভিযোগ, বারবার শুধু আশ্বাস মিলছে, কিন্তু বাস্তবে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।
অভিভাবক পরিতোষ মণ্ডলের কথায়, "সব স্কুলে পরীক্ষা চলছে। অথচ আমাদের ছেলেমেয়েরা চার মাস ধরে ঘরে বসে। ওরা অধিকাংশই গরিব পরিবারের সন্তান। প্রাইভেট টিউশন পড়ানোর সামর্থ্য নেই। স্কুলই ছিল একমাত্র ভরসা। এখন অনেকেই বই-খাতা ছেড়ে শ্রমিকের কাজে চলে যাচ্ছে। এ ভাবে চলতে থাকলে ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে।" অভিভাবকদের দাবি, প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতার খেসারত দিচ্ছে নিরীহ পড়ুয়ারা।
প্রশাসনের আশ্বাস
জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক মৃণ্ময় রায় বলেন, “স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের বিষয়টি জানিয়েছে। সোমবারই পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রশাসনিক অনুমতি মিললেই স্কুল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিংও জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তিনি বলেন, “ওই স্কুলে এখনও কেন কেন্দ্রীয় বাহিনী রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”
প্রশ্নের মুখে শিক্ষার অধিকার
শিক্ষামহলের একাংশের মতে, নির্বাচন শেষ হওয়ার এত দিন পরেও যদি একটি স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে যায় এবং তার জেরে কয়েকশো পড়ুয়ার শিক্ষা ব্যাহত হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, ক্ষতিটা শুধু কয়েক মাসের ক্লাস বন্ধ হওয়ার নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে পড়াশোনার মান, পরীক্ষার ফল এবং বহু পড়ুয়ার ভবিষ্যতের উপরও।
এখন মালদার শান্তা দেব্যা হাইস্কুলের সাড়ে ৮০০-রও বেশি পড়ুয়া, তাঁদের অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা একটাই অপেক্ষায়, কবে স্কুল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী সরবে, আর কবে আবার ঘণ্টা পড়বে শ্রেণিকক্ষে।