বিশেষ প্রতিবেদন: সংখ্যার বিচারে জিতলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু রাজনীতি কি শুধু জনসমাগমের অঙ্কে মাপা যায়? নাকি কোনও কর্মসূচির আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে প্রতিপক্ষের শক্তিকে কতটা নাড়া দেওয়া গেল, সেই হিসেবের মধ্যে? এ বছরের ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিল।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে একুশে জুলাই মানেই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তির মহড়া। ধর্মতলা থেকে ভিক্টোরিয়া চত্বর— গোটা এলাকা কার্যত দলীয় রঙে ঢেকে যেত। রাজ্যের প্রতিটি জেলা থেকে ট্রেন, বাস, লরি বোঝাই কর্মী-সমর্থক কলকাতায় পৌঁছতেন। শিয়ালদহ, হাওড়া, ধর্মতলা— সর্বত্র শুধু সবুজ-সাদা পতাকার ঢেউ। সেই পরিচিত ছবিটাই এবার ভেঙে গেল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর দল ভেঙে দু'ভাগ। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবির। ফলে ইতিহাসে প্রথমবার, শহিদ দিবস পালিত হল দু'টি আলাদা মঞ্চে। সেই সঙ্গে দিল্লিতে বিদ্রোহী সাংসদরাও আলাদা মঞ্চ করে শহিদ দিবস পালন করলেন৷ সেদিক থেকে তিনটি মঞ্চে এবারে তৃণমূলের শহিদ সমাবেশ পালিত হল পৃথক পৃথকভাবে৷
ভিড়ের লড়াইয়ে এগিয়ে মমতা
বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে মমতার সভায় ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্যাথিড্রাল রোডের বড় অংশ জুড়ে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি দেখা যায়। মমতার নামে স্লোগান, দলীয় পতাকার মিছিল— সব মিলিয়ে পুরনো দিনের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।
অন্যদিকে, মেয়ো রোডে ঋতব্রত শিবিরের সভা দিনের প্রথম ভাগে অনেকটাই ফাঁকা ছিল। মঞ্চের সামনে অসংখ্য চেয়ার খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে অবশ্য ভিড় কিছুটা বাড়ে। তবু তুলনামূলক বিচারে মমতার সভাই জনসমাগমে স্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, জনসমাগমের হিসেবই শেষ কথা নয়। বরং প্রশ্ন হল, দল ভেঙে যাওয়ার পরও মমতাকে কেন একই দিনে বিকল্প শহিদ দিবসের মুখোমুখি হতে হল?
এক সময় যে একুশে জুলাই ছিল শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক মঞ্চ, সেখানে এবার সমান্তরাল কর্মসূচি আয়োজনই বিদ্রোহী শিবিরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, এই প্রথম শহিদ দিবসের একচ্ছত্র রাজনৈতিক মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠল।
৬০-র বেশি বিধায়ক, তবুও ভিড় কোথায়?
ঋতব্রত শিবিরের দাবি, তৃণমূলের ৬০-র বেশি বিধায়ক তাঁদের পাশে রয়েছেন। রাজ্যের একাধিক প্রভাবশালী নেতা-প্রাক্তন মন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন মেয়ো রোডের মঞ্চে। বিশেষ করে বীরভূমের অনুব্রত মণ্ডল প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, তিনি একাই জেলা থেকে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই বিপুল জনসমাগমের প্রতিফলন সভাস্থলে চোখে পড়েনি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, সাংগঠনিক শক্তির যে দাবি বিদ্রোহী শিবির করছে, তা কি এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি? নাকি তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল অন্য?
লক্ষ্য কি ভিড় নয়, মমতার একচ্ছত্র আধিপত্যে ফাটল?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, ঋতব্রত শিবিরের উদ্দেশ্য হয়তো মমতার চেয়ে বেশি ভিড় দেখানো ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল মমতার সবচেয়ে আবেগঘন রাজনৈতিক কর্মসূচির একচ্ছত্র চরিত্র ভেঙে দেওয়া। সেই দিক থেকে দেখলে তারা অনেকটাই সফল।
একুশে জুলাই মানেই এতদিন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। এবার সেই একই দিনে, মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে আরেকটি শহিদ মঞ্চ তৈরি হয়েছে। কর্মী-সমর্থকদের একাংশ বিভ্রান্ত হয়েছেন, নেতা-প্রাক্তন মন্ত্রীদের উপস্থিতি ভাগ হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের ফোকাসও ভাগ হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে 'দুই তৃণমূল'।
শুভেন্দুর মন্তব্যের সঙ্গে মিলছে কি ছবিটা?
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, আগামী দিনে বাংলার রাজনীতি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন সেই লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করছে। বিদ্রোহী শিবিরের অস্তিত্ব যত দৃশ্যমান হবে, মমতার রাজনৈতিক আধিপত্য ততটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সেই অর্থে ২১ জুলাইয়ের সমান্তরাল কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি সভা নয়, বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রকাশ্য প্রদর্শন।
দিনের শেষে কার লাভ?
সংখ্যার বিচারে জয় মমতার। কিন্তু প্রতীকী রাজনীতির বিচারে লড়াইটা এত সহজ নয়।
মমতা তাঁর ঐতিহ্য, আবেগ ও জনসমর্থনের বড় অংশ ধরে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে প্রথমবার নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দিবসেই প্রতিদ্বন্দ্বী মঞ্চের অস্তিত্ব মেনে নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবির হয়তো জনসমাগমে পিছিয়ে। কিন্তু তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তৃণমূলের রাজনীতিতে তারা আর প্রান্তিক শক্তি নয়। বরং মমতার রাজনৈতিক পরিসরকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অবস্থানে পৌঁছেছে।
সেই কারণেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মূল্যায়ন, একুশের ময়দানে ভিড়ে এগিয়ে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কিন্তু দিনের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দখল করে শেষ হাসিটা হয়তো হেসেছে ঋতব্রত শিবিরই। এখন দেখার, 15 বছরের রাজ্যপাট খুইয়ে ভাঙন ধরা দলকে ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুরে দাঁড় করাতে পারেন নাকি আগামীদিনে তা আরও ক্ষয়িষ্ণু আকার নেয় ! সময়েই মিলবে তার সদুত্তর ৷