কলকাতা: বাঘের নাম উঠলেই এতদিন চোখের সামনে ভেসে উঠত সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। কিন্তু আগামী দিনে সেই ছবিতে জুড়তে পারে ডুয়ার্সের ঘন অরণ্যও। বহু বছরের অপেক্ষার পর উত্তরবঙ্গের বক্সা টাইগার রিজার্ভে আবারও স্থায়ীভাবে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বসবাসের পথ খুলতে চলেছে। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে খুব শীঘ্রই বক্সার জঙ্গলে ছাড়া হবে নতুন বাঘ। ফলে নামের সঙ্গে বাস্তবেরও মিল ফিরে পাবে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই ব্যাঘ্র প্রকল্প।
এক সময় বক্সা ছিল বাঘের অন্যতম আবাস। কিন্তু শিকার, বনাঞ্চলের পরিবর্তন এবং মানুষের অনুপ্রবেশের জেরে ধীরে ধীরে সেখান থেকে হারিয়ে যায় বাঘ। গত কয়েক বছরে ভুটান বা অসমের জঙ্গল থেকে কোনও কোনও বাঘ মাঝে মাঝে বক্সায় ঢুকেছে, ক্যামেরা ট্র্যাপেও ধরা পড়েছে তাদের ছবি। কিন্তু স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে ওঠেনি। সেই পরিস্থিতিই এবার বদলাতে চাইছে বন দফতর এবং ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)।
তবে বাঘ এনে জঙ্গলে ছেড়ে দিলেই কাজ শেষ নয়। তার আগে বাঘের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই কোর এলাকার গ্রামগুলির পুনর্বাসনের কাজ জোরকদমে চলছে। ইতিমধ্যেই একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসিত করা হয়েছে। বাকি গ্রামগুলির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জঙ্গলে হরিণ, গৌর, বুনো শূকরের মতো শিকার প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানো, বনভূমির উন্নয়ন, কড়া নজরদারি এবং চোরাশিকার রুখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্ষা শেষ হলে পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে চলতি বছরের অক্টোবর থেকেই বাঘ স্থানান্তরের কাজ শুরু হতে পারে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পুনর্বাসনের অগ্রগতি এবং আবহাওয়ার উপর। গোটা প্রক্রিয়াই হবে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ ২০২২ সালের সর্বভারতীয় বাঘ গণনায় বক্সায় কোনও স্থায়ী বাঘের অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। যদিও চলতি বছর ক্যামেরা ট্র্যাপে একটি বাঘের ছবি মিলেছে, যা প্রমাণ করে ভুটান ও অসমের সঙ্গে বক্সার বন করিডর এখনও সচল। সেই প্রাকৃতিক সংযোগকেই কাজে লাগিয়ে উত্তরবঙ্গে আবার সুস্থ বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তোলাই এখন লক্ষ্য।
পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, পরিকল্পনা সফল হলে শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণই নয়, উত্তরবঙ্গের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও বড় ভূমিকা নেবে এই প্রকল্প। একই সঙ্গে নতুন মাত্রা পাবে ডুয়ার্সের বনভিত্তিক পর্যটন। সুন্দরবনের পাশাপাশি বাঘ দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে বক্সাও হয়ে উঠতে পারে অন্যতম আকর্ষণ।
দীর্ঘদিন ধরে 'টাইগার রিজার্ভ' নামটি যেন ছিল কেবল কাগজে-কলমে। এবার সেই পরিচয়কে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার পথে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হল। সব পরিকল্পনা সফল হলে খুব শিগগিরই ডুয়ার্সের অরণ্যেও প্রতিধ্বনিত হবে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। আর উত্তরবঙ্গ ফিরে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া বনসম্রাটকে।