বাঁকুড়া: শিল্পের মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র নতুন বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিই শোনালেন না। সেই মঞ্চকেই রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার করে তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার বাঁকুড়ার মেজিয়ার একটি ইস্পাত শিল্প সংস্থার কারখানা সম্প্রসারণ প্রকল্পের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে পূর্বসূরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাম না করেই একাধিক ইস্যুতে নিশানা করেন তিনি। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, হিন্দিভাষী ভোটব্যাঙ্ক— তিনটি বিষয়কে একই সূত্রে বেঁধে নিজের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বহু প্রতীক্ষিত ওই সম্প্রসারণ প্রকল্প। তাঁর দাবি, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। শুধু কারখানার ভিতরেই নয়, পরিবহণ, লজিস্টিক্স, নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি। স্থানীয় যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়োগেও অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে শিল্পের সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়েই রাজনৈতিক আক্রমণে সুর চড়ান শুভেন্দু। মঞ্চ থেকে পূর্বসূরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করেই বলেন, “আপনার হাতে অনেক সময় আছে এখন। এক বার এসে এই প্ল্যান্টের ভিতরটা দেখে যাবেন। উনি কথায় কথায় হিন্দিভাষীদের বলেন, ওরা বহিরাগত।” তাঁর দাবি, এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা বহু শ্রমিক ও কর্মী কাজ করছেন। শিল্পের বিকাশের জন্য দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হয়, সেখানে ভাষা বা রাজ্যের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতি কোনও কাজে আসে না বলেই ইঙ্গিত দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক তাৎপর্য দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। গত কয়েক বছরে বাংলার রাজনীতিতে ‘বহিরাগত’ শব্দটি বহুবার উঠে এসেছে। বিজেপির অভিযোগ ছিল, তৃণমূল নেতৃত্ব বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীকে ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা দিতে গিয়ে এই শব্দ ব্যবহার করেছে। অন্য দিকে তৃণমূলের দাবি ছিল, তাদের আপত্তি কোনও ভাষাভাষী মানুষের বিরুদ্ধে নয়, বাইরে থেকে এসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনে শিল্পের মঞ্চ থেকে হিন্দিভাষী কর্মীদের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু আসলে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
শিল্পায়ন নিয়েও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে একহাত নেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের পরিবেশ নষ্ট হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা রাজ্যে আসতে চাইতেন না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জমি ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিল্পবান্ধব নীতির ফলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে বলে দাবি করেন তিনি। মেজিয়ার এই প্রকল্পকে সেই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন।
বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-পশ্চিম বর্ধমান শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাঢ়বঙ্গকে আবার শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। পুরনো শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ এনে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই ভারী শিল্প, ইস্পাত, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ক্ষমতায় আসার পর শিল্পায়নকে সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে বিজেপি। আর সেই প্রেক্ষাপটে মেজিয়ার মঞ্চ থেকে শুভেন্দুর বক্তব্য ছিল দ্বিমুখী— এক দিকে বিনিয়োগকারীদের কাছে শিল্পবান্ধব সরকারের বার্তা, অন্য দিকে বিরোধী শিবিরকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং হিন্দিভাষী ভোট— এই তিনটি ইস্যুতেই আগামী দিনে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে চলেছে।