কলকাতা: হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী স্বস্তি মিলেছিল বৃহস্পতিবার। আদালতের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিল কালীঘাট তৃণমূল। কিন্তু সেই স্বস্তি কাটতে না কাটতেই ফের বড় ধাক্কা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তের স্বার্থে কালীঘাট তৃণমূলের আরও ১২টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিল রাজ্য পুলিশ। ফলে এখন পর্যন্ত মোট ১৫টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তদন্তের আওতায় চলে এল।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই ১৫টি অ্যাকাউন্টে মিলিয়ে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা জমা রয়েছে। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের জেরেই একের পর এক এই পদক্ষেপ। ইতিমধ্যেই নতুন করে ফ্রিজ হওয়া ১২টি অ্যাকাউন্টের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, স্টেটমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট নথি চেয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্ককে নোটিস পাঠিয়েছে পুলিশ।
এই মামলার সূত্রপাত ঋতব্রত শিবিরের এক তৃণমূল বিধায়কের অভিযোগ থেকে। তাঁর অভিযোগ, কালীঘাট তৃণমূলের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থের অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে রাজ্য পুলিশ। প্রথমে তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়। তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে আরও একাধিক অ্যাকাউন্টের তথ্য। তার ভিত্তিতেই এবার আরও ১২টি অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, আগে ফ্রিজ হওয়া তিনটি অ্যাকাউন্টেই প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা ছিল। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় কালীঘাট তৃণমূল। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানিয়ে দেন, দলের নিত্যদিনের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাজ চালাতে ওই তিনটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে। তবে সেই অনুমতি নিঃশর্ত নয়।
আদালত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ পর্যবেক্ষক (স্পেশাল অফিসার) হিসেবে নিয়োগ করেছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনিই অ্যাকাউন্টগুলির সমস্ত আয়-ব্যয়ের উপর নজর রাখবেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অনুমোদিত দু'জন স্বাক্ষরকারী যৌথভাবে সই করে টাকা তুলতে পারবেন। তবে প্রতিটি লেনদেনের হিসাব স্পেশাল অফিসারকে জানাতে হবে এবং তাঁর কাউন্টার সই ছাড়া কোনও খরচ কার্যকর হবে না।
কিন্তু আদালতের সেই স্বস্তির রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই নতুন করে ১২টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে জোর চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ মেনে নিতে নারাজ অভিযোগকারী পক্ষ। ঋতব্রত শিবির ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তিনটি অ্যাকাউন্ট আংশিক সচল রাখার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তারা সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করবে।
এদিকে মামলাটি এখন আর শুধু রাজ্য পুলিশের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-ও এই আর্থিক লেনদেনের তদন্তে সক্রিয় হয়েছে। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং তথাকথিত 'কাটমানি'-র বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যাঙ্কে জমা থাকার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। সেই সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। ইতিমধ্যেই প্রথম তিনটি অ্যাকাউন্টে ইডিও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি পুলিশের ফ্রিজ করা নতুন ১২টি অ্যাকাউন্টের নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, হাইকোর্টে আংশিক স্বস্তি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও ১২টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়া এই মামলাকে নতুন মোড় দিয়েছে। একদিকে আদালতের কড়া নজরদারি, অন্যদিকে রাজ্য পুলিশ ও ইডির সমান্তরাল তদন্ত—সব মিলিয়ে হাজার কোটির আর্থিক লেনদেনের এই মামলায় আগামী দিনে আরও বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।