বারুইপুর: আদালতে তোলার আগে অভিযুক্তদের নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সতর্কতা নেওয়া নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সেই সতর্কতাই যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তখন তা আর শুধুমাত্র নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ঘিরে অশান্তির মামলায় গ্রেফতার সিপিএম নেতা লাহেক আলিকে সোমবার বারুইপুর আদালতে মাথায় হেলমেট পরিয়ে হাজির করানোকে কেন্দ্র করে ঠিক এমনই এক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। পুলিশের দাবি, সম্ভাব্য হামলা থেকে অভিযুক্তকে রক্ষা করতেই এই ব্যবস্থা। অন্যদিকে সিপিএমের অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা হয়েছে।
রবিবার গভীর রাতে লাহেক আলিকে গ্রেফতার করে বারুইপুর পুলিশ জেলা। সোমবার সকালে তাঁকে কড়া নিরাপত্তায় বারুইপুর মহকুমা আদালতে নিয়ে আসা হয়। আদালত চত্বরে প্রিজন ভ্যানের দরজা খুলতেই দেখা যায়, মাথায় কালো হেলমেট পরে নেমে আসছেন লাহেক আলি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি এবং ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেন একজন রাজনৈতিক নেতাকে হেলমেট পরিয়ে আদালতে আনা হল, তা নিয়েই শুরু হয় জল্পনা।
পুলিশ সূত্রের ব্যাখ্যা, আদালত চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তদন্তকারীদের কাছে আগাম খবর ছিল, অভিযুক্তকে লক্ষ্য করে কেউ ডিম, ইট, পাথর বা অন্য কোনও বস্তু ছুড়ে মারার চেষ্টা করতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বহুচর্চিত মামলায় আদালত চত্বরে অভিযুক্তদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই কোনও ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে লাহেক আলির মাথায় হেলমেট পরানো হয়।
তদন্তকারী সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, লাহেক আলি প্রথমে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে নিতে চাননি। তিনি পুলিশকে জানান, তাঁর বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই এবং তিনি স্বাভাবিক ভাবেই আদালতে যেতে চান। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না পুলিশ। শেষ পর্যন্ত পুলিশই তাঁকে হেলমেট পরিয়ে আদালত চত্বরে নিয়ে আসে।
এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সিপিএম। দলের একাংশের অভিযোগ, যদি সত্যিই হামলার আশঙ্কা থাকে, তা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব। অভিযুক্তকে হেলমেট পরিয়ে আদালতে হাজির করানো কার্যত তাঁকে জনসমক্ষে অপমানিত করারই কৌশল। বাম নেতৃত্বের দাবি, এটি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
লাহেক আলির বিরুদ্ধে অবশ্য গুরুতর অভিযোগ এনেছে পুলিশ। বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর যে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর এবং পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘটনায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ২০টি ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা, সরকারি কর্মীর কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, উস্কানি, বেআইনি জমায়েত-সহ একাধিক গুরুতর ধারা। পাশাপাশি ভারতীয় রেল আইনেরও দুটি ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।
অন্যদিকে, সিপিএম শুরু থেকেই এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। দলের রাজ্য নেতা সুজন চক্রবর্তীর অভিযোগ, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে চাপে রাখতেই আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আদালতেই এই অভিযোগের জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দল।
সোমবার আদালতে লাহেক আলির পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী তথা সিপিএম নেতা সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, তদন্তকারীরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের মিল নেই। বরং ওই ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, লাহেক আলি উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন এবং পুলিশকেও সহযোগিতা করছেন। তা সত্ত্বেও তাঁকেই মূল অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই মামলা সাজানো হয়েছে। তাঁর কথায়, “আগের সরকার যেমন বিরোধীদের বিরুদ্ধে আইন ব্যবহার করত, বর্তমান সরকারও একই পথ অনুসরণ করছে।”