ঝাড়গ্রাম: কাজুর বীজের বাজার আছে, কিন্তু ফলের নেই। বছরের পর বছর গাছ থেকে ঝরে পড়ে পচে যায় হাজার হাজার টন কাজু আপেল। কোথাও তা গবাদি পশুর খাবার, কোথাও আবার জঙ্গলের হাতির খাদ্য। অথচ সেই ফলই গোয়ার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মদ ‘ফেনি’ তৈরির মূল উপাদান। জঙ্গলমহলেও সেই শিল্প গড়ে তোলার ভাবনার কথা জানালেন ঝাড়গ্রামের বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউ। তাঁর দাবি, উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি কারখানাই নয়, জঙ্গলমহলের অর্থনীতির নতুন দরজাও খুলে যেতে পারে।
জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে কাজুবাগান। নয়াগ্রাম, ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর, জামবনি-সহ একাধিক ব্লকে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে কাজুর চাষ হয়। কিন্তু কাজুবাদাম সংগ্রহের পর যে ফলটি থেকে যায়, তার কোনও বাণিজ্যিক ব্যবহার না থাকায় অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যায়। সেই অপচয় রুখতেই কাজু আপেল প্রক্রিয়াজাত করে ‘কেশিও ওয়াইন’ তৈরির কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক।
লক্ষ্মীকান্ত সাউ বলেন, “জঙ্গলমহলে কাজুর উৎপাদন প্রচুর। কিন্তু বীজ তুলে নেওয়ার পরে গোটা ফলটাই নষ্ট হয়ে যায়। গোয়ার মতো এখানেও যদি কেশিও ওয়াইন তৈরির কারখানা গড়ে তোলা যায়, তা হলে কৃষকের অতিরিক্ত আয় হবে। একই সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বিদেশেও এই পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব।”
গোয়ার পরিচিত পানীয় উরাক ও ফেনি— দু'টিই তৈরি হয় কাজু আপেল থেকে। প্রথমে গাঁজনের মাধ্যমে তৈরি হয় উরাক। পরে বিশেষ পাতন প্রক্রিয়ায় তা থেকে তৈরি হয় ফেনি, যার আন্তর্জাতিক বাজারও রয়েছে। সেই প্রযুক্তিকে জঙ্গলমহলে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ফলের মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জেলা উদ্যানপালন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়গ্রাম জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে কাজুর চাষ হয়। প্রতি বছর উৎপন্ন হয় প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাজু আপেল। অথচ জুস, জ্যাম, জেলি কিংবা কেশিও ওয়াইন তৈরির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে তার প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়।
চাষিদের মতে, এই শিল্প গড়ে উঠলে লাভবান হবেন তাঁরাই। শালবনির কাজুচাষি শ্যামসুন্দর মাহাত বলেন, “এখন কাজুর ফলের কোনও দাম নেই। বীজ তুলে নেওয়ার পরে সব ফেলে দিতে হয়। যদি ফল বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়, তা হলে চাষিদের আয় অনেকটাই বাড়বে। কারখানা হলে আর এত ফল নষ্ট হবে না।”
শুধু কৃষক নন, আশার আলো দেখছেন এলাকার বেকার যুবকরাও। নয়াগ্রামের বাসিন্দা প্রশান্ত বেরা বর্তমানে গুজরাটে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। তাঁর কথায়, “জঙ্গলমহলে চাষের বাইরে কাজের সুযোগ খুব কম। তাই আমাদের বাইরে যেতে হয়। এখানে যদি শিল্প গড়ে ওঠে, তা হলে অনেকেই নিজের জেলাতেই কাজের সুযোগ পাবেন।”
তবে আপাতত পরিকল্পনাটি প্রাথমিক পর্যায়ে। কারখানা গড়তে প্রয়োজন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সরকারি অনুমোদন এবং বাজার তৈরি। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবের মুখ দেখলে, এত দিন যে কাজু আপেলকে বর্জ্য বলে ফেলে দেওয়া হতো, সেটাই জঙ্গলমহলের নতুন অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে— এমন আশাই দেখছেন চাষি থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা।