নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: আজকের আকাশগঙ্গা, অসংখ্য নক্ষত্রের বিশাল সংসার। তারই এক কোণে রয়েছে আমাদের সৌরমণ্ডল, পৃথিবী। কিন্তু এই বিশাল ছায়াপথের শৈশব কেমন ছিল? কী ভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হল আজকের মিল্কি ওয়ে? সেই সুদূর অতীতের একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের হদিস পেলেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন বছর আগে, মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র দু’বিলিয়ন বছর পরেই একটি ছোট ছায়াপথকে গিলে নিয়েছিল সদ্য বেড়ে ওঠা মিল্কি ওয়ে। নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেই প্রাচীন মহাজাগতিক সংযুক্তির স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
ঘটনাটি এতটাই প্রাচীন যে, পৃথিবীতে তখনও মানুষের অস্তিত্বের কোনও প্রশ্নই নেই। সূর্যের জন্মও হয়নি। অথচ সেই সময়েই মহাবিশ্বের এক প্রান্তে নিজের আকার বাড়াতে শুরু করেছে আমাদের ছায়াপথ। আর সেই বৃদ্ধির পথে একটি ছোট ‘বামন ছায়াপথ’ এসে মিশে যায় তার সঙ্গে। বিজ্ঞানীরা সেই হারিয়ে যাওয়া ছায়াপথের নাম দিয়েছেন LKH Low-energy-Kraken-Heracles।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Astronomy পত্রিকায়। এত কোটি বছর আগের কোনও সংঘর্ষের ছবি সরাসরি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীরা খুঁজেছেন তার রেখে যাওয়া চিহ্ন। সেই কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গ্লোবুলার ক্লাস্টার, মহাকাশে থাকা গোলাকার নক্ষত্রগুচ্ছ, যেখানে হাজার থেকে লক্ষ লক্ষ পুরনো নক্ষত্র একসঙ্গে আবদ্ধ থাকে। এই নক্ষত্রগুচ্ছগুলিকে কার্যত মহাজাগতিক ‘জীবাশ্ম’ হিসাবেই ব্যবহার করেছেন গবেষকেরা।
গবেষকেরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের প্রায় ২০ হাজার আলোকবর্ষের এলাকার মধ্যে থাকা ৩৯টি প্রাচীন গ্লোবুলার ক্লাস্টার পরীক্ষা করেন। হাবলের শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ থেকে নক্ষত্রগুচ্ছগুলির বয়স এবং রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা হয়। সেই তথ্যের সঙ্গে গাইয়া মহাকাশযানের নক্ষত্রগুলির গতিবিধি সংক্রান্ত নিখুঁত তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। তখনই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত তৃতীয় গোষ্ঠী।
বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ওই নক্ষত্রগুচ্ছগুলিকে মোটামুটি তিনটি আলাদা গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়। প্রথম গোষ্ঠীটি মিল্কি ওয়ের নিজের প্রাচীন নক্ষত্রগুচ্ছ। দ্বিতীয় গোষ্ঠী এসেছে প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া Gaia-Sausage-Enceladus নামের একটি ছায়াপথের সঙ্গে সংযুক্তির সময়। কিন্তু তৃতীয় গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য কোনওটির সঙ্গেই মেলে না।
তাদের বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং গতিপথ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নক্ষত্রগুচ্ছগুলি আসলে অন্য একটি ছায়াপথে জন্মেছিল। পরে সেই ছায়াপথটি মিল্কি ওয়ের মহাকর্ষের টানে এসে তার অংশ হয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়া ছায়াপথই LKH। অর্থাৎ, আজকের আকাশগঙ্গার শরীরে এখনও বহন করা হচ্ছে প্রায় ১২ বিলিয়ন বছর আগের অন্য একটি ছায়াপথের ‘অবশেষ’।
LKH আজকের মিল্কি ওয়ের তুলনায় ছিল অনেক ছোট। কিন্তু সেই সময়ের তরুণ আকাশগঙ্গাও আজকের মতো বিশাল ছিল না। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, LKH-তে থাকা নক্ষত্রগুলির মোট ভর ছিল প্রায় ৫০ কোটি সূর্যের সমান। সেই সময়ের মিল্কি ওয়ের তুলনায় সেটি ছিল যথেষ্ট বড় একটি সংযোজন—প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান নাক্ষত্রিক ভর।
শুধু কয়েকটি নক্ষত্র নয়। এই সংযুক্তির মাধ্যমে মিল্কি ওয়ের প্রাথমিক কাঠামোয় যোগ হয়েছিল নক্ষত্র, গ্যাস এবং ডার্ক ম্যাটারও। ফলে আজকের আকাশগঙ্গার ভিত গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই প্রাচীন সংঘর্ষের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। এত দিন পর্যন্ত মিল্কি ওয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো নিশ্চিত বড় ধরনের সংযুক্তির অন্যতম উদাহরণ হিসেবে প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগের Gaia-Sausage-Enceladus ঘটনাকে ধরা হত। নতুন গবেষণা সেই ইতিহাসকে আরও ১.৮ বিলিয়ন বছর পিছিয়ে দিল। অর্থাৎ, আকাশগঙ্গা যখন একেবারে শিশু, তখনই সে অন্য একটি ছায়াপথকে নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি শুধু একটি সংঘর্ষের গল্প নয়, এটি মিল্কি ওয়ের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসের একেবারে গোড়ার অধ্যায়ের সন্ধান।
গবেষণার প্রধান লেখক ডেভিদে মাস্সারির কথায়, আমরা যে মিল্কি ওয়েকে নিজেদের ‘বাড়ি’ বলি, সেই বাড়িটি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। নতুন গবেষণা সেই বাড়ির প্রথম দিকের একটি বড় অংশের ‘ইট’ কোথা থেকে এসেছিল, তার সূত্র দিয়েছে। ‘ছায়াপথের সংঘর্ষ’ শুনলে মনে হতে পারে, কোটি কোটি নক্ষত্র একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল। বাস্তবে ছবিটা এত সরল নয়।
একটি ছায়াপথের ভিতরের বিপুল দূরত্বের কারণে নক্ষত্রগুলির সরাসরি সংঘর্ষ তুলনামূলক ভাবে বিরল। তবে দুই ছায়াপথের গ্যাসের মেঘ পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেলে তীব্র ভাবে নতুন নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এই ধরনের সংযুক্তিই তরুণ মিল্কি ওয়ের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে।
আর এখানেই বদলে যাচ্ছে আকাশগঙ্গার ‘শৈশবের গল্প’। আগে মনে করা হত, তার প্রথম দিকের বিবর্তনের বড় অংশই ঘটেছিল ছায়াপথের নিজের ভিতরে নক্ষত্র তৈরির মাধ্যমে। নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, বাইরের ছায়াপথ থেকে আসা নক্ষত্র ও পদার্থও সেই নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
আজ থেকে ১১.৮ বিলিয়ন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ছোট ছায়াপথটির আর কোনও আলাদা অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তার নক্ষত্রেরা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে মিল্কি ওয়ের ভিতরেই। হাবল ও গাইয়ার তথ্য সেই নক্ষত্রগুলির বয়স, রাসায়নিক পরিচয় এবং গতিপথ পড়ে যেন আকাশগঙ্গার ‘ডিএনএ’ থেকে উদ্ধার করেছে তার জন্মের পুরনো ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস বলছে, মিল্কি ওয়ে কোনও দিন একা বড় হয়নি। অন্য এক ছায়াপথকে নিজের মধ্যে মিশিয়েই শুরু হয়েছিল তার বিশাল হয়ে ওঠার যাত্রা।