শ্রাবণের আকাশে সেদিনও হয়তো মেঘ ছিল, বৃষ্টির রেশে সিক্ত ছিল পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তর। অথচ প্রকৃতির সেই চিরচেনা বর্ষণকে ছাপিয়ে ২২শে শ্রাবণ আজও বয়ে আনে এক গভীর বিষণ্ণতার আবহ। এই দিনটি যেন সময়ের বুকের এক অনির্বচনীয় ক্ষত, যার ব্যথা মুছে যায়নি শতাব্দীর স্রোতেও।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রমণ্ডল, যাঁর দীপ্তি কেবল একটি যুগকে আলোকিত করেনি, স্পর্শ করেছে মানুষের অন্তর্জগতের সুদূরতম প্রদেশ। তাঁর কলমে প্রকৃতি পেয়েছে আত্মার ভাষা, প্রেম পেয়েছে নির্মলতার ব্যঞ্জনা, বিরহ পেয়েছে নান্দনিক মহিমা, আর মানুষের ক্ষুদ্র জীবন পেয়েছে অসীমের দিকে তাকিয়ে থাকার এক অনন্ত অবকাশ।
২২শে শ্রাবণ তাই নিছক একটি প্রয়াণদিন নয়; এটি এক মহাজাগতিক নৈঃশব্দ্যের দিন। যে কণ্ঠ একদিন বাংলা ভাষার অন্তর্লীন সৌন্দর্যকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছিল এই বর্ষণমুখর দিনে। কিন্তু সৃষ্টিশীলতার প্রকৃত মৃত্যু হয় না। দেহের অবসান ঘটে, অথচ সৃষ্টির অনুরণন সময়ের সীমারেখা অতিক্রম করে ক্রমশ আরও দূরে, আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আজও যখন শ্রাবণের মেঘ নিঃশব্দে আকাশ ঢেকে দেয়, যখন বৃষ্টিধারা জানালার কাচে বিষণ্ণ ছন্দ তোলে, যখন কোনো নির্জন বিকেলে মন অকারণে উদাস হয়ে ওঠে, তখন কোথাও যেন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির আবহ এসে মিশে যায় সেই মুহূর্তের নিঃসঙ্গতায়। তাঁর সাহিত্য আমাদের কেবল পাঠের বিষয় নয়; তা আমাদের অনুভবের এক দীর্ঘ পরম্পরা, আমাদের চিন্তার এক নীরব সহযাত্রী।
তাঁর চলে যাওয়ার দিনটি তাই শোকের অন্ধকারে সম্পূর্ণ আবৃত নয়। বরং সেখানে রয়েছে এক গভীর উপলব্ধির আলো, মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলে যায়; কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টির মৃত্যু নেই। শব্দের শরীর ক্ষয় হয়, অথচ তার আত্মা থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, অনুভবে, সংস্কৃতিতে।
২২শে শ্রাবণ সেই অমোঘ সত্যেরই স্মারক। বৃষ্টিভেজা এই দিনে তাই প্রণাম জানাই সেই মহীরুহকে, যাঁর সৃষ্টির ছায়ায় বাংলা ভাষা আজও তার সৌন্দর্য, সংবেদন ও আত্মমর্যাদাকে খুঁজে পায়। শ্রাবণের আকাশ যতবার মেঘে ভারী হবে, বৃষ্টির ধারা যতবার পৃথিবীকে সিক্ত করবে, ততবারই নিঃশব্দে ফিরে আসবে তাঁর স্মৃতি, কালের অতলান্ত অন্ধকার ভেদ করে, এক অনন্ত আলোকরেখার মতো।