নিউজ ডেস্ক: গণতন্ত্র বাঁচানোর ডাক দিয়েছে বিজেপি। স্লোগান, ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’। কলকাতার পর এ বার শিলিগুড়ি। সোমবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গে একই কর্মসূচিতে শামিল হওয়ার কথা মুখ্যমন্ত্রীর। আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্র রক্ষার এই রাজনৈতিক উদ্যোগের উদ্দেশ্য মহৎ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতায় আসীন একটি দলকে কেন বারবার গণতন্ত্র বাঁচানোর স্লোগান তুলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হচ্ছে? আর সেই স্লোগানের আড়ালে যদি বিরোধী মতকে কোণঠাসা করার রাজনৈতিক কৌশলই প্রধান হয়ে ওঠে, তা হলে এই কর্মসূচির পরিণতি শেষ পর্যন্ত বিজেপির জন্যই আত্মঘাতী হতে পারে।
রাজনীতিতে আন্দোলন, মিছিল, পাল্টা মিছিল নতুন কিছু নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদের প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই শাসক দলেরও নিজেদের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা এবং বিরোধিতার ভূমিকার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা ভুলে গেলে বিপদ। বিরোধী দল প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে পারে। কিন্তু শাসক দলের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা নয়, বরং প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনের বদলে শাসক দল যদি বিরোধীদের প্রতিটি প্রতিবাদকে অরাজকতার তকমা দিতে শুরু করে, তা হলে গণতন্ত্রের পরিসরই ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিজেপির এই কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া অবশ্যই জরুরি। মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা বেআইনি ভাবে অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় একজন বৈধ ভোটারের নাম যাতে কোনও ভাবেই বাদ না পড়ে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটাধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার। ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, নথিপত্র যাচাই এবং নাম বাদ পড়লে আপিলের সুযোগ নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলির উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। বিরোধীরা প্রশ্ন তুললেই তাঁদের অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষক কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোনও সুস্থ রাজনৈতিক যুক্তি নেই।
বস্তুত, এসআইআর নিয়ে বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টেও উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাদ পড়া নামের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। আদালতও আপিলের নিষ্পত্তি এবং ভোটারদের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি যে নিছক রাজনৈতিক প্রচারের বিষয় নয়, তার প্রমাণ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শাসক দলের দায়িত্ব হওয়া উচিত মানুষের আশঙ্কা দূর করা এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলা। অথচ বিজেপির প্রচারে যদি গোটা বিষয়টি বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংঘর্ষে পর্যবসিত হয়, তা হলে আসল সমস্যাটিই আড়ালে থেকে যাবে।
আরও একটি বিষয় বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কলকাতার মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধীদের আক্রমণ করতে গিয়ে ‘আরশোলা’, ‘ছারপোকা’ এবং ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর মতো শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন বলে খবর। রাজনৈতিক বিরোধিতা নিশ্চয়ই থাকবে, তীব্র সমালোচনাও হবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করে আক্রমণ করার মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কোনও পরিচয় নেই। বরং এই ধরনের ভাষা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতাকেই উসকে দেয়। যাঁরা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিজেপির সমর্থক যেমন রয়েছেন, তেমনই বিরোধী দলের সমর্থকও রয়েছেন। বিরোধী দলের সমর্থক মানেই তাঁরা গণতন্ত্রের শত্রু, এমন ধারণা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানেই বিজেপির কর্মসূচির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা। এক দিকে গণতন্ত্র রক্ষার ডাক, অন্য দিকে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে আক্রমণ করার প্রবণতা। এক দিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কথা, অন্য দিকে সেই প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তোলা রাজনৈতিক দলগুলিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। গণতন্ত্র কি তবে শুধুই শাসক দলের পছন্দের মতামত প্রকাশের অধিকার? বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকবে না? নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা যাবে না? সরকারের কাজের সমালোচনা করলেই কি অরাজকতা ছড়ানোর অভিযোগ উঠবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর বিজেপিকে দিতে হবে।
শিলিগুড়ির মিছিলের রাজনৈতিক গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। উত্তরবঙ্গ বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বড় জমায়েত করে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করা এবং বিরোধীদের কাছে শক্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই কর্মসূচির পিছনে আরও একটি রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। কলকাতা ও হাওড়া-সহ রাজ্যের একাধিক পুরসভায় আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনকে সক্রিয় করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক জমি আরও শক্ত করার লক্ষ্যও স্পষ্ট। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাজ্যের ৮০০ জায়গায় মিছিল করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। অর্থাৎ গণতন্ত্র রক্ষার স্লোগানের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রস্তুতির অঙ্কও যথেষ্ট স্পষ্ট।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই মিছিল কি সত্যিই মানুষের মনে আস্থা তৈরি করবে? নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে? শুধু জনসমাগমের সংখ্যা দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি মাপা যায় না। হাজার হাজার মানুষ মিছিলে হাঁটলেই গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়ে যায় না। গণতন্ত্রের আসল শক্তি নিহিত রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সম্মান, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকারের মধ্যে। এই মৌলিক শর্তগুলি অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলেরই সবচেয়ে বেশি।
বিজেপির মনে রাখা উচিত, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা শাসক, কাল তারা বিরোধী হতে পারে। আজ যে রাজনৈতিক দল বিরোধীদের প্রতিবাদের অধিকারকে খাটো করছে, কাল সেই দলকেও হয়তো একই অধিকার নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। তখন অন্য কোনও শাসক যদি তাদের প্রতিবাদকে অরাজকতা বলে দাগিয়ে দেয়, তা হলে অভিযোগ জানানোর নৈতিক ভিত্তি কতটা থাকবে?
গণতন্ত্র বাঁচানোর মিছিল করতে হলে প্রথমে গণতান্ত্রিক আচরণে তার প্রমাণ দিতে হয়। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার হুঁশিয়ারি দিয়ে, কটূক্তি করে কিংবা প্রতিটি প্রশ্নকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। বরং তাতে শাসক দলের আত্মবিশ্বাসের অভাবই প্রকাশ পায়। বিজেপি যদি সত্যিই গণতন্ত্র রক্ষায় আন্তরিক হয়, তা হলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবেই মেনে নিতে হবে। মিছিলের নামে শক্তি প্রদর্শন সাময়িক রাজনৈতিক উন্মাদনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে গেলে প্রয়োজন সংযম, সহিষ্ণুতা এবং জবাবদিহি। সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগানই এক দিন বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। আত্মঘাতী হওয়ার আশঙ্কা ঠিক সেখানেই।




