স্বাগত ভট্টাচার্য্য: ৩২তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) নতুন লোগোটি নকশা করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সন্দীপ রায়। রাজ্যে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর ১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে নন্দনে এই লোগোটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। বিগত ২০১৫ সাল থেকে চলে আসা চেনা 'নীল-সাদা' লোগোটি বদলে এবার স্থান পেয়েছে 'কালো এবং গেরুয়া' (Saffron) রঙের থিম, যা নিয়ে ইতিমিধ্যেই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
নান্দনিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
নতুন এই লোগোটির একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন বা ক্রিটিক করলে শিরোনাম হিসেবে বলা যেতে পারে, রঙের রাজনীতি বনাম নান্দনিক স্বাধীনতা। লোগোটির সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান বদল ঘটেছে এর রঙের ব্যবহারে। ২০১৫ সালের লোগোটিতে তৎকালীন শাসকদলের পছন্দের 'নীল-সাদা' রঙের আধিপত্য ছিল, যা এবার বদলে গিয়ে 'গেরুয়া' ও কালোর সংমিশ্রণে রূপ নিয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নিজস্ব নিরপেক্ষ সত্তা থাকা প্রয়োজন। শিল্পের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই রঙের ক্ষমতার লড়াই বা "গৈরিকীকরণ" বনাম "নীল-সাদাকরণ" শিল্পের নিজস্ব নান্দনিকতাকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করে।
টাইপোগ্রাফি এবং ডিজাইন এলিমেন্ট
নতুন নকশায় কালো রঙের ফন্টের সাথে স্প্রোকেট বা ফিল্মের রিলের খাঁজকাটা অংশগুলোতে দেওয়া হয়েছে গেরুয়া রঙের ছোঁয়া। ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে, সন্দীপ রায়ের এই ডিজাইনটি চলচ্চিত্র উৎসবের মূল সত্তা অর্থাৎ 'সেলুলয়েড ফিল্ম' বা রিলকে লোগোর ফন্টের ভেতরেই জ্যামিতিকভাবে ধারণ করতে পেরেছে। এটি আগের লোগোর চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট এবং সিনেমা-কেন্দ্রিক। তবে ফিল্মের খাঁজকাটা নকশার সাথে রঙের ব্যবহারটি এতটাই চড়া যে, চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক আবেদন ছাপিয়ে অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিকভাবে রাজনৈতিক বার্তাটিই দর্শকের চোখে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।
ঐতিহ্যের ছোঁয়া ও আধুনিকতার অভাব
উৎসবের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯৯৫-এ যখন এটি ক্যালকাটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা CFF ছিল এর প্রথম লোগোটির ভাবনার পেছনেও ছিলেন সন্দীপ রায়। সেই আদি শিল্পভাবনাকে আধুনিক রূপ দিতেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ক্রিটিক হিসেবে বলা যায় সত্যজিৎ রায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে সন্দীপ রায়ের রেখাচিত্র বা স্কেচধর্মী কাজে সবসময় একটা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি ঘরানা থাকে। লোগোটির কাঠামোতে সেই ঘরানার ছোঁয়া ছিল স্পষ্ট। কিন্তু গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর সমসাময়িক লোগো ডিজাইনের ট্রেন্ড যা সাধারণত অত্যন্ত মিনিমালিস্ট, ফ্ল্যাট এবং ফিউচারিস্টিক হয়, তার সাথে এটি কতটা খাপ খাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। লোগোটির ফন্ট বা আকৃতিতে বৈশ্বিক আধুনিকতার চেয়ে ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দিকেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের প্রতীক ও স্ববিরোধিতা
পূর্বের লোগোটিতে 'KIFF' শব্দের প্রথম দুটো 'F' অক্ষরের মাথায় ছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ডানাওয়ালা পরীর বা এঞ্জেল অফ ভিকট্রি যা একটি অবয়ব কাকতালীয়ভাবে। এবার উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম থেকে সরিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগের লোগোতে কলকাতার আইকন হিসেবে ভিক্টোরিয়ার পরীকে যেভাবে সংকেত আকারে রাখা হয়েছিল, নতুন লোগোতে অক্ষরের ভেতরের সলিড জ্যামিতিক ডিজাইন সেই সূক্ষ্মতা কিছুটা হারিয়েছে। তবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে মূল অনুষ্ঠানস্থল করার সিদ্ধান্তের সাথে নতুন লোগোর কাঠামোগত সামঞ্জস্য কতটা তৈরি হবে, তা উৎসবের মূল প্রচারণায় লোগোটি ব্যবহারের পর আরও স্পষ্ট হবে।
সামগ্রীক মূল্যায়নে বলাযায়, ৩২তম KIFF-এর নতুন লোগোটি গঠনগত দিক থেকে স্পষ্ট এবং সিনেমা-বান্ধব যা মুলত ফিল্ম রিলের মোটিফের কারণে হলেও এটি "শিল্পের চেয়ে রঙের রাজনীতির" বিতর্কেই বেশি জড়িয়ে পড়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচয় তার লোগোর রঙে নয়, বরং সেখানে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের গুণমান এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। লোগোর এই পরিবর্তন যদি কেবলই রাজনৈতিক প্রতীকী লড়াই না হয়ে উৎসবের সার্বিক মানোন্নয়নের অংশ হয়, তবেই এর প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকবে।




