বিশেষ প্রতিবেদন: বিরল খনিজের পর এ বার নির্মাণ সরঞ্জাম! আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের আধিপত্যকে হাতিয়ার করে ফের চাপ তৈরির পথে চিন? বেজিংয়ের নয়া রফতানি নিয়ন্ত্রণ ঘিরে এমনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বার চিনের নিশানায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার বিশালাকার যন্ত্র, যেগুলির এক একটির ওজন প্রায় পাঁচ হাজার টন। রাস্তা, রেলপথ, মেট্রো কিংবা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরিতে এই যন্ত্রের জুড়ি নেই। আর এই যন্ত্রের আন্তর্জাতিক বাজারে চিনের দাপট যথেষ্ট। ফলে নতুন বিধিনিষেধের জেরে সমস্যায় পড়তে পারে ভারতও। বিশেষ করে হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণের যে বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে, তাতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিনের নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম)। বিশালাকার এই যন্ত্র পাহাড় বা মাটির গভীরে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে ব্যবহার করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরির তুলনায় এই প্রযুক্তিতে কাজ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ। শুধু টিবিএম নয়, উঁচু পার্বত্য এলাকায় কংক্রিট ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্রপাতিও নতুন বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে। চিনের যুক্তি, এই ধরনের সরঞ্জাম অসামরিক কাজের পাশাপাশি সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণেও ব্যবহার করা সম্ভব। তাই ‘দ্বৈত ব্যবহার’-এর সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই রফতানিতে কড়াকড়ি করা হচ্ছে।
বেজিংয়ের বক্তব্য, চিনের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে এমন সংবেদনশীল দেশ ও অঞ্চলে এই সরঞ্জাম রফতানির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম কার্যকর হবে। ভারত-চিনের মধ্যে হিমালয় সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদ রয়েছে। ফলে চিনের এই নয়া নীতির প্রভাব ভারতের উপরেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় দ্রুত সেনা মোতায়েনের সুবিধার জন্য ভারত যে ভাবে রাস্তা, রেলপথ ও সুড়ঙ্গ নির্মাণে জোর দিচ্ছে, সেখানে টানেল বোরিং মেশিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন ভারতের উদ্বেগ?
হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় পরিকাঠামো গড়ে তোলা ভারতের কাছে কৌশলগত ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দিতে নতুন রাস্তা, রেললাইন এবং সুড়ঙ্গ তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলির জন্য প্রয়োজন বিপুল সংখ্যক বিশেষজ্ঞ যন্ত্র। চিনের রফতানি নিয়ন্ত্রণের ফলে নতুন যন্ত্র আমদানিতে দেরি হলে নির্মাণের সময়সীমা পিছিয়ে যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, যন্ত্রগুলির যন্ত্রাংশ সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ টানেল বোরিং মেশিনের আন্তর্জাতিক বাজারে চিনের আধিপত্য বিপুল। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই শিল্পে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বাজার তাদের দখলে। চিনের অন্যতম বড় নির্মাতা সংস্থা ‘চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইকুইপমেন্ট গ্রুপ’-এর দাবি, তাদের তৈরি যন্ত্রপাতি ডেনমার্ক ও ফ্রান্স-সহ ৩৬টি দেশে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বহু দেশই এই বিশেষ প্রযুক্তির জন্য চিনের উপর নির্ভরশীল।
ভারতের ক্ষেত্রে অবশ্য এই নির্ভরতার সমস্যা নতুন নয়। ২০২৪ সালেই জার্মানির নির্মাণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থা হেরেনকনেখটের তৈরি টানেল বোরিং মেশিন ভারতে আনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সংস্থাটির কিছু যন্ত্র চিনে তৈরি হয়। সেগুলি ভারতে বিক্রির ক্ষেত্রে চিনের তরফে বাধা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ওই যন্ত্রগুলি আহমেদাবাদ-মুম্বই বুলেট ট্রেন প্রকল্প এবং দিল্লি মেট্রোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহারের কথা ছিল। পরে অবশ্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে চলতি বছরের মার্চে ভারত যন্ত্রগুলি হাতে পায়। নতুন বিধিনিষেধের খবর সামনে আসার পর হেরেনকনেখট জানিয়েছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
পুরনো যন্ত্র নিয়েও আশঙ্কা
নতুন নিয়মের প্রভাব শুধু ভবিষ্যতে কেনা যন্ত্রের উপরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ, চিনের বিধিনিষেধে যন্ত্রাংশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। টানেল বোরিং মেশিনের মতো বিশাল যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করতে হলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ বদলানো প্রয়োজন। কাজের সময় পাথর ও মাটির ঘর্ষণে যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ক্ষয় হয়। ফলে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে যন্ত্রাংশ না মিললে আগে থেকে চালু থাকা প্রকল্পেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নয়াদিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভারত এক প্রকল্প থেকে অন্য প্রকল্পে যন্ত্র সরিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ বা ব্যাহত হলে পুরনো যন্ত্রগুলির রক্ষণাবেক্ষণও কঠিন হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, নতুন যন্ত্র কেনার পাশাপাশি আগে থেকে ব্যবহৃত যন্ত্র সচল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিকল্প কোথায়?
চিনের বাইরে জার্মানি, আমেরিকা এবং জাপানের কয়েকটি সংস্থা এই ধরনের সুড়ঙ্গ খোঁড়ার যন্ত্র তৈরি করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধান পাওয়া অসম্ভব নয়। বরং চিনের কড়াকড়িতে ওই সংস্থাগুলির ব্যবসার সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু সমস্যা হল, চিনের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা এবং কম খরচের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ নয়। অল্প সময়ের মধ্যে অন্য দেশের যন্ত্র ব্যবহার শুরু করাও কঠিন। কারণ, প্রতিটি প্রকল্পের ভূপ্রকৃতি ও নির্মাণের প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রের নকশা এবং প্রযুক্তি আলাদা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দেশেই টানেল বোরিং মেশিন তৈরির ক্ষমতা গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে ভারত। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গডকড়ি জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে সুড়ঙ্গ নির্মাণ খাতে ৯৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে ভারতের। দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলিকে এই ধরনের যন্ত্র তৈরিতে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। নির্মাণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে উৎসাহ দিতে প্রায় ১২০ কোটি ডলারের আর্থিক প্রণোদনা প্রকল্প নিয়েও সরকার ভাবনাচিন্তা করছে বলে খবর।
দেশের অন্যতম বড় পরিকাঠামো সংস্থা লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর প্রেসিডেন্ট আর শঙ্কর রমনের কথায়, তাঁদের সংস্থা একটি টানেল বোরিং মেশিনের প্রোটোটাইপ তৈরি করছে। পরীক্ষা সফল হলে ভবিষ্যতে নিজেরাই প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরি করতে এবং অন্য সংস্থাকেও সরবরাহ করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি। তবে চিনের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা এবং কম দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যে সহজ হবে না, তা-ও স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে চিনের নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণ ভারতের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এক দিকে সীমান্তবর্তী পরিকাঠামো নির্মাণের গতি বজায় রাখা, অন্য দিকে বিদেশি সরবরাহকারীর উপর নির্ভরতা কমানো। বিরল খনিজের পর নির্মাণ সরঞ্জামও যদি বেজিংয়ের কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তা হলে ভারতের পরিকাঠামো পরিকল্পনায় দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন আরও জরুরি হয়ে উঠবে।




