হাবিবুর রহমান, ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রমনা কালী মন্দিরটি ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত হিন্দু মন্দিরসমূহের মধ্যে অন্যতম। প্রতিবছর ঘটা করে রমনা কালীমন্দিরে কালীপুজো হয়ে থাকে। রমনা ‘কালীবাড়ি’ নামেও পরিচিত। এটি প্রায় এক হাজার বছরেরও পুরাতন বলে বিশ্বাস করা হয়। অবশ্য ইংরেজ শাসনামলে এই মন্দিরটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। রমনা কালী মন্দিরের কালী বিগ্রহ অন্যতম। পাথরের বেদির ওপর শ্রীশ্রীভদ্রকালীর সুউচ্চ প্রতিমা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনারা দেশের অন্য মন্দিরের মতো রমনা কালীমন্দিরটিও গুড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রমনা কালী মন্দির কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে এক ঘন্টার মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি লোককে হত্যা করে। মন্দির চত্বরে আশ্রয় নেওয়া বেশ কিছু মুসলমানকেও হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কের (বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অবস্থিত। পুরাতন রমনা কালী মন্দিরটি বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির দুর্লভ নিদর্শন ছিলো।
ভারত সরকারের অর্থায়নে বর্তমানে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের চূড়ার বর্তমান উচ্চতা ৯৭ ফুট। জনশ্রুতি আছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে বদরীনাথের যোশীমঠ থেকে গোপালগিরি নামে এক উচ্চমার্গের সন্ন্যাসী ঢাকায় এসে সাধন-ভজনের জন্য এখানে একটি আখড়া গড়ে তোলেন। সেখানেই ২০০ বছর পরে মূল রমনা কালীমন্দিরটি নির্মাণ করেন আর এক বড় সাধু হরিচরণ গিরি। তবে পরবর্তী সময়ে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারকার্য ভাওয়ালের ভক্তিমতী ও দানশীলা রানি বিলাসমণি দেবীর আমলেই হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ। এই দুটো দিন রমনা কালীমন্দিরের পবিত্র ভূমি ঘিরে পাকিস্তানি সেনারা যে গণহত্যা পরিচালনা করেছিল তা রমনা গণহত্যা নামে পরিচিত।

এক তীর্থভূমি রাতারাতি পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে। রমনা কালীমন্দিরের অধ্যক্ষ স্বামী পরমানন্দ গিরিসহ সেখানে উপস্থিত প্রায় ১০০ জন নারী ও পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাক সেনারা। শিশুরাও রেহাই পায়নি। এই হত্যাকাণ্ডের সময় রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম দাউ দাউ করে জ্বলেছিল। রমনা কালীমন্দিরের চূড়া ছিল ১২০ ফুট, যা বহুদূর থেকে দেখা যেত। সেটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ওই বর্বর সেনারা। পাকিস্তানি সৈন্যরা রমনা ত্যাগ করার আগে, জীবিত লোকদের পরের দিন সকালে ভারতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। রমনা কালী মন্দিরের অধ্যক্ষ প্রয়াত পরমানন্দ গিরির স্ত্রী সুচেতা গিরি এবং মা আনন্দময়ী আশ্রমের তপস্বী জটালী মা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকেদের সাথে রমনা ছেড়েছিলেন।
একাত্তরের এপ্রিল-মে মাস নাগাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনায় পুনরায় পাকিস্তানি বর্বররা হামলা চালায়। মন্দির এবং আশ্রমবাসী যারা গণহত্যা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা আবার ফিরে আসেন এবং সেখানে অস্থায়ী ভিটা করে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে পুজো অর্চনার জন্য অস্থায়ী মন্দির স্থাপন করেন। রমনার শাহবাজ জামে মসজিদের খাদেম আবদুল আলি ফকির, জটালী মা এবং সুচেতা গিরি রমনা কালী মন্দির ও শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রমের ভক্তবৃন্দ ও অন্যান্য বাসিন্দাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করে মন্দির ও আশ্রম পুনঃনির্মাণের অনুরোধ জানিয়ে তাঁর কাছে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন। বঙ্গবন্ধু শহীদ পরিবারের উত্তরাধিকারীদের প্রত্যেককে একটি করে শংসাপত্র ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০০০ টাকার একটি চেক হাতে দিয়ে মন্দিরটি পোস্তগলা শ্মশানে স্তানান্তর করতে বলেন। ১৯৭৩ সালের ১৩মে সেখানকার বাসিন্দাদের পোস্তগলায় পাঠানো হয়।

সেখানে শ্মশান সংলগ্ন বালুর মাঠে তারা বসতি স্থাপন করেন। তাদের জন্য রেশনের ব্যবস্থাও ছিল। ১৯৮৪ সালে মন্দির এবং আশ্রম ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে রতন সরকার বাদী হয়ে ঢাকার দেওয়ানী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। নব্বইয়ের দশকে ‘জটালী মা' দেহ ত্যাগ করেন। ২০০০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত গণতদন্ত কমিশনের সাংবাদিক সম্মেলনে রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ গণতদন্ত কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এবং বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসাই রণবীর রায় চৌধুরীর একক উদ্যোগে মন্দিরটি পুনঃস্থাপিত হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের জমির একাংশ পুনরুদ্ধার হলে পুজোর্চ্চনাও শুরু হয়। ২০০৬ সালে ভারত সরকার মন্দির ও আশ্রম পুণঃনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালে রমনা কালী মন্দিরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০বছর পূর্তিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তা উদ্বোধন করেন আর রমনা কালী মন্দির ফিরে পায় তার ৫ শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। রমনা কালী মন্দিরে দেবী কালীর বিগ্রহ তন্ত্রশাস্ত্রে মা কালীর নানাপ্রকারের বিগ্রহভেদ বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে রমনা কালী মন্দিরের কালী বিগ্রহ অন্যতম। পাথরের বেদির ওপর শ্রীশ্রীভদ্রকালীর সুউচ্চ প্রতিমা। চতুর্ভুজা মাতৃবিগ্রহ। মহাদেবের শয়ান বিগ্রহের ওপর দণ্ডায়মান। দু’পাশে ডাকিনী-যোগিনী। ভদ্রকালিকা দেবীর কণ্ঠে মুণ্ডমালা। লালজবার মালা। দেবী মা লাল বস্ত্র পরিহিতা। ভদ্রকালিকার একপাশে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদামণির ছবি। রমনা কালী মন্দিরে বর্তমানে কালী বিগ্রহ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে।

তাদের মধ্যে অন্যতম হলো, দুর্গা মন্দির, লোকনাথ মন্দির, রাধা গোবিন্দ মন্দির, মা আনন্দময়ীর মন্দির। মন্দিরটির স্থাপত্য শৈলী বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। মন্দিরের সামনে একটি বড় দিঘি আছে যা একসময় উপাসক এবং দর্শনার্থীদের সাঁতার কাটার জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান ছিল। বর্তমানে পুকুরটি প্রায় সারাবছর পদ্মগুল্মে পূর্ণ থাকে। প্রতি বছরই পুকুরের মাঝবরাবর বৃহৎ দেবমূর্তি নির্মাণ করা হয়। মন্দিরটিতে একটি উঁচু চূড়া রয়েছে। মন্দিরের পাশেই ছিল মা আনন্দময়ী আশ্রম, সেখানে থাকা ও স্নান করার সুবিধা ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী " অপারেশন সার্চলাইট " শুরু করে। অপারেশনটি একটি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত করে। অপারেশন সার্চলাইটের বেশিরভাগ লক্ষ্য ছিল তরুণ হিন্দু পুরুষ, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং শিক্ষাবিদরা। অপারেশন সার্চলাইটকালে জগন্নাথ হলে হিন্দু ছাত্রদের গণহারে হত্যা করা হয়।




