নয়াদিল্লি: 'ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় নয়া দিশা! টাইপ-২ ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সেমাগ্লুটাইডের ওরাল ট্যাবলেট তৈরির ছাড়পত্র পেল দেশের বৃহত্তম ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির অন্যতম সান ফার্মা। কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ফলে এ বার বাজারে আসার পথ খুলল সংস্থাটির দিনে এক বার খাওয়ার ওষুধের। ৩, ৭ এবং ১৪ মিলিগ্রাম—তিনটি মাত্রায় পাওয়া যাবে এই ট্যাবলেট। ইতিমধ্যেই এই ওষুধের বাজারে রয়েছে টরেন্ট ফার্মা ও ডক্টর রেড্ডিজ়ের মতো সংস্থা। সান ফার্মার প্রবেশে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছে ওষুধ শিল্প। তার প্রভাব পড়তে পারে ওষুধের দাম এবং রোগীদের চিকিৎসার সুযোগের উপরেও।
সেমাগ্লুটাইড কী? কী ভাবে কাজ করে?
সেমাগ্লুটাইড এক ধরনের জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট। মানুষের শরীরে খাবার গ্রহণের পর অন্ত্র থেকে নির্গত একটি হরমোনের মতো কাজ করে এই ওষুধ। এর ফলে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য মেলে এবং গ্লুকাগন নামের হরমোনের নিঃসরণ কমে। পাশাপাশি পাকস্থলী থেকে খাবার বেরোনোর গতি কিছুটা ধীর করে এবং দীর্ঘ ক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই টাইপ-২ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সেমাগ্লুটাইড ওজন কমানোর চিকিৎসাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ডায়াবিটিস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত সেমাগ্লুটাইডের ওষুধ, মাত্রা ও অনুমোদিত প্রয়োগ এক নয়। কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন ধরনের ওষুধ প্রয়োজন, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করেন।
ইঞ্জেকশনের বদলে ট্যাবলেট, সুবিধা কোথায়?
এত দিন সেমাগ্লুটাইডের পরিচিতি মূলত সাপ্তাহিক ইঞ্জেকশনের জন্য। কিন্তু ওরাল সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি ট্যাবলেট খেতে হয়। ফলে যাঁরা নিয়মিত ইঞ্জেকশন নিতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাঁদের কাছে এটি বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সান ফার্মার নতুন ওষুধটি মূলত নোভো নরডিস্কের তৈরি ‘রাইবেলসাস’-এর সমতুল্য চিকিৎসাগত কার্যকারিতার দাবি নিয়ে বাজারে আসার অনুমোদন পেয়েছে। তিনটি মাত্রায় ওষুধটি পাওয়া যাবে—৩, ৭ এবং ১৪ মিলিগ্রাম।
সংস্থার অসমের কামরূপের কারখানায় এই ওষুধ তৈরি হবে। সক্রিয় উপাদান সংগ্রহ করা হবে চিনের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা থেকে। তবে ট্যাবলেট মানেই যে কোনও সময়ে বা খাবারের সঙ্গে খেয়ে নেওয়া যাবে, তা নয়। ওরাল সেমাগ্লুটাইড সাধারণত সকালে খালি পেটে অল্প জলের সঙ্গে খেতে হয়। ওষুধ খাওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট খাবার, পানীয় বা অন্য কোনও ওষুধ গ্রহণ করা যায় না। নিয়ম মেনে না খেলে শরীরে ওষুধের শোষণ কমে যেতে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যেই রয়েছে প্রতিযোগী
সেমাগ্লুটাইডের মূল পেটেন্টের মেয়াদ ভারতে ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়ার পর দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের মধ্যে এই ওষুধ তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তবে ওরাল সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রে পেটেন্ট সংক্রান্ত পৃথক আইনি জটিলতা রয়েছে। টরেন্ট ফার্মা ইতিমধ্যেই ‘সেমালিক্স’ এবং ‘সেম্বোলিক’ নামে ওরাল সেমাগ্লুটাইড বাজারে এনেছে।
অন্য দিকে, ডক্টর রেড্ডিজ় ল্যাবরেটরিজ় ‘ওবেদা’ নামে এই ওষুধ বাজারে এনেছে। তাদের ওষুধের ৩, ৭ এবং ১৪ মিলিগ্রাম মাত্রার জন্য পৃথক দামও নির্ধারিত হয়েছে। এ বার সান ফার্মার অনুমোদন পাওয়ায় এই বাজারে আরও বড় প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সংস্থাটির বিস্তৃত বিপণন ব্যবস্থা এবং দেশজুড়ে ওষুধ সরবরাহের পরিকাঠামো বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প বিশেষজ্ঞেরা।
কমতে পারে ওষুধের দাম ?
এই মুহূর্তে সেমাগ্লুটাইডের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাম। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ওষুধ কেনার খরচ অনেক রোগীর কাছেই বড় বাধা। একাধিক সংস্থা বাজারে এলে দামের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তাতে রোগীদের জন্য চিকিৎসা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওষুধ শিল্পের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে ইঞ্জেকশন ও ট্যাবলেট মিলিয়ে জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধের বাজার দ্রুত বাড়ছে। ফার্মাট্র্যাকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ডায়াবিটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় এই ধরনের ওষুধের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক সংস্থা বাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চাইছে। তবে দাম কমলেই যে সব রোগীর জন্য ওষুধটি উপযুক্ত হয়ে উঠবে, এমন নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেটের অস্বস্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে পিত্তথলির সমস্যা বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতাও হতে পারে। বিশেষ করে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর অন্য ওষুধের সঙ্গে ব্যবহার করলে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সেমাগ্লুটাইড কোনও সাধারণ ওজন কমানোর ওষুধ নয়। টাইপ-২ ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করতে হলে রোগীর শারীরিক অবস্থা, অন্যান্য অসুখ, চলতি ওষুধ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিচার করা জরুরি। গর্ভাবস্থায় এই ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তনও প্রয়োজন।
চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
সান ফার্মার অনুমোদনের খবর এমন এক সময়ে এল, যখন ওরাল সেমাগ্লুটাইডের পেটেন্ট নিয়ে নোভো নরডিস্কের সঙ্গে ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের আইনি বিবাদ চলছে। ট্যাবলেটের বিশেষ ফর্মুলেশন ও ওষুধ শরীরে শোষিত হওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে এই বিরোধ। ফলে অনুমোদন পেলেই যে কোনও সংস্থা অবিলম্বে বাজারে ওষুধ বিক্রি শুরু করতে পারবে, বিষয়টি তেমন নয়। আইনি বাধা এবং আদালতের নির্দেশও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, সান ফার্মার নতুন অনুমোদন ভারতের ডায়াবিটিস চিকিৎসার বাজারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইঞ্জেকশনের পাশাপাশি ট্যাবলেটের বিকল্প বাড়লে রোগীদের চিকিৎসা বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই ওষুধ কতটা সাশ্রয়ী হবে, কত দ্রুত বাজারে আসবে এবং আইনি জটিলতা কতটা কাটবে—তার উপরেই নির্ভর করছে নতুন এই ওষুধের সাফল্য।




