বিশেষ প্রতিবেদন: স্বাস্থ্যের কথা ভেবে ভাতের থালা থেকে সাদা চাল সরিয়ে বাদামি চাল বেছে নিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু সত্যিই কি ব্রাউন রাইস রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর? সাম্প্রতিক গবেষণার বিশ্লেষণে উঠে এল চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। চালের রং নয়, বরং তার প্রজাতি ও রান্নার পদ্ধতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভাত ছাড়া বাঙালির দিন চলে না। কিন্তু স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাবারের তালিকায় সাদা ভাতের জায়গা ক্রমশ দখল করছে বাদামি চাল বা ব্রাউন রাইস। ধারণা, সাদা চালের তুলনায় এতে ফাইবার বেশি, পুষ্টিগুণ বেশি, আর ডায়াবিটিসের ঝুঁকিও কম।
সেই কারণেই ওজন নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্তে শর্করার মাত্রা সামলানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ব্রাউন রাইসকে এগিয়ে রাখেন পুষ্টিবিদদের একাংশ। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণা কি পুরোপুরি ঠিক? সাম্প্রতিক গবেষণার পর্যালোচনা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বাদামি চালের কিছু পুষ্টিগত সুবিধা থাকলেও, সেটি খেলেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে, এমন জোরালো প্রমাণ এখনও মেলেনি।
চাল মূলত শর্করাজাতীয় খাবার। হজমের পর তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়। শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে কিংবা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই কোন ধরনের চাল খাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
বাদামি চাল কেন বেশি স্বাস্থ্যকর বলে পরিচিত?
সাদা ও বাদামি চালের মূল পার্থক্য প্রক্রিয়াকরণে। ধানের উপরিভাগের আঁশসমৃদ্ধ স্তর বা ব্র্যান এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর ভ্রূণাংশ বা জার্ম বাদ দিয়ে চাল পালিশ করা হলে তা সাদা চাল হয়ে ওঠে। অন্য দিকে, বাদামি চালে এই বাইরের স্তরগুলি অনেকটাই অক্ষত থাকে। ফলে এতে ফাইবার, ম্যাগনেশিয়াম, বি ভিটামিন-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান বেশি পাওয়া যায়।
বাদামি চালের ফাইবার হজমের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। ফলে শর্করা ধীরে ধীরে ভেঙে রক্তে মেশে। সেই যুক্তিতেই মনে করা হয়, সাদা চালের তুলনায় বাদামি চাল খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। ২০২২ সালে ‘বিএমজে ওপেন’-এ প্রকাশিত আটটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার পর্যালোচনায় ৫ লক্ষ ৭৭ হাজারেরও বেশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
সেখানে দেখা যায়, প্রতিদিন রান্না করা সাদা চালের পরিমাণ প্রায় ১৫৮ গ্রামের দু’টি পরিবেশনের বেশি হলে, অতিরিক্ত প্রতি পরিবেশনের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অন্য দিকে, ২০১০ সালের একটি গবেষণায় প্রায় ১ লক্ষ ৯৭ হাজার আমেরিকানের উপর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছিল, প্রতিদিন ৫০ গ্রাম রান্না করা সাদা চালের পরিবর্তে বাদামি চাল খেলে টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ কম হতে পারে।
কিন্তু পরীক্ষায় মিলল না তেমন প্রমাণ
সমস্যা হল, পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় কোনও খাবারের সঙ্গে রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেলেই প্রমাণ হয় না যে ওই খাবারই ঝুঁকি কমাচ্ছে। যাঁরা বাদামি চাল খান, তাঁদের জীবনযাপনের ধরনও অনেক সময় অন্য রকম হয়। তাঁরা তুলনামূলক বেশি শরীরচর্চা করেন, ধূমপান কম করেন এবং সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার খান। ফলে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি কম হওয়ার পিছনে শুধু বাদামি চালের ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফলাফলও খতিয়ে দেখেছেন। ২০২২ সালের ওই পর্যালোচনায় ১,০৩৪ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা ১১টি র্যান্ডমাইজ়ড নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এক দলকে বাদামি চাল এবং অন্য দলকে সাদা চাল খেতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফলাফলে রক্তে শর্করার স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য কোনও পার্থক্য পাওয়া যায়নি। ইনসুলিনের কার্যকারিতা কিংবা রক্তচাপের ক্ষেত্রেও বাদামি চালের স্পষ্ট সুবিধা প্রমাণিত হয়নি। অর্থাৎ, বাদামি চাল পুষ্টিগুণে এগিয়ে থাকলেও শুধু সাদা চালের বদলে বাদামি চাল খেলেই ডায়াবিটিসের ঝুঁকি কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই।
চালের রং নয়, আসল ভূমিকা কোন উপাদানের?
গবেষণায় উঠে এসেছে, রক্তে শর্করার মাত্রা কত দ্রুত বাড়বে, তা অনেকটাই নির্ভর করে চালের মধ্যে থাকা ‘অ্যামাইলোজ়’ নামের এক ধরনের শ্বেতসারের উপর। এই উপাদান সহজে হজম হয় না। ফলে যে চালে অ্যামাইলোজ়ের পরিমাণ বেশি, তা খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ়ের মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়তে পারে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত ৩২টি র্যান্ডমাইজ়ড নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার একটি পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছিল, চাল খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা কতটা বাড়বে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অ্যামাইলোজ়ের পরিমাণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ, বাদামি না সাদা—শুধু এই পার্থক্য দিয়ে চালের স্বাস্থ্যগুণ বিচার করা যথেষ্ট নয়। কোন প্রজাতির চাল খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সেদ্ধ চাল কি বাদামি চালের চেয়েও ভাল?
চাল প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিও রক্তে শর্করার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, ধান থেকে চাল তৈরির আগে ভিজিয়ে বাষ্পে সেদ্ধ করার পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পারবয়েলিং’। এই পদ্ধতিতে চালের বাইরের স্তরে থাকা কিছু বি ভিটামিন দানার ভিতরে চলে আসে। পাশাপাশি শ্বেতসারের গঠনেও পরিবর্তন ঘটে, ফলে তা হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নিতে পারে।
২০১৮ সালে ‘নিউট্রিশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, সাধারণ সাদা চালের বদলে পারবয়েলড চাল খেলে ডায়াবিটিস নেই এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাবারের পরের দুই ঘণ্টায় রক্তে শর্করার সামগ্রিক বৃদ্ধি ৩৮ শতাংশ কম হতে পারে। ওই পরীক্ষায় সাধারণ বাদামি চালের তুলনায়ও পারবয়েলড চালের কিছু সুবিধা দেখা গিয়েছিল।
রান্না করা ভাত ঠান্ডা করলেও বদলায় শ্বেতসারের চরিত্র
ভাত রান্নার পর ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলেও শ্বেতসারের কিছুটা পরিবর্তন হয়। তৈরি হয় ‘রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ’, যা সহজে হজম হয় না। ফলে শরীরে গ্লুকোজ়ের প্রবেশের গতি কিছুটা কমতে পারে। সাদা ও বাদামি—দু’ধরনের চালের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। তবে ভাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। রান্না করা ভাত ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা উচিত নয়। ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রুখতে রান্নার এক ঘণ্টার মধ্যে তা ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখতে হবে। পরের দিন খাওয়ার আগে ভাল ভাবে গরম করতে হবে। বারবার গরম করা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
সব মিলিয়ে গবেষণার ইঙ্গিত, বাদামি চালকে এক কথায় সাদা চালের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর বলে ঘোষণা করা যাচ্ছে না। ফাইবার ও খনিজের দিক থেকে বাদামি চালের সুবিধা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চালের প্রজাতি, অ্যামাইলোজ়ের পরিমাণ এবং রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু চালের রং বদলালেই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হবে না। কতটা ভাত খাচ্ছেন, সঙ্গে কী খাবার থাকছে এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন—সেই হিসাবও সমান জরুরি।




