কলকাতা: চিকিৎসক বনাম আমলা—কে বেশি যোগ্য, কার প্রশাসনিক দক্ষতা বেশি, তা নিয়ে চাপানউতোর নতুন নয়। এ বার সেই দুই পেশার দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের। চিকিৎসকেরাও যাতে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস) হওয়ার সুযোগ পান, সেই মর্মে নবান্নে চিঠি পাঠাল স্বাস্থ্যভবন। রাজ্যের দুই ধরনের চিকিৎসক ক্যাডারকে আইএএস পদে মনোনয়নের যোগ্য সরকারি ক্যাডারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসকদের সামনে খুলে যেতে পারে আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছনোর নতুন দরজা।
স্বাস্থ্যভবনের চিঠি গিয়েছে নবান্নের কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতর বা পার-এর কাছে। সেখানে ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক হেলথ অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস—এই দুই ক্যাডারের চিকিৎসকদের আইএএস হওয়ার জন্য বিবেচনাযোগ্য তালিকায় রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নন-স্টেট সিভিল সার্ভিস বা নন-এসসিএস কোটার মাধ্যমে এই সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের বক্তব্য, চিকিৎসকেরা উচ্চশিক্ষিত এবং যথেষ্ট যোগ্য। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই কারণেই তাঁদের ক্যাডারগুলির নাম আইএএস মনোনয়নের যোগ্য ক্যাডারের তালিকায় যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতর।
কোন চিকিৎসকেরা পাবেন এই সুযোগ?
স্বাস্থ্যভবনের প্রস্তাবে মূলত দু’ধরনের চিকিৎসকদের কথা বলা হয়েছে। প্রথম গোষ্ঠীতে রয়েছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক হেলথ অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের চিকিৎসকেরা। ব্লক মেডিক্যাল অফিসার (বিএমওএইচ) থেকে শুরু করে অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ মেডিক্যাল অফিসার (এসিএমওএইচ), ডেপুটি চিফ মেডিক্যাল অফিসার (ডিসিএমওএইচ), চিফ মেডিক্যাল অফিসার (সিএমওএইচ) হয়ে ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিসেস (ডিএইচএস) পর্যন্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলান এই ক্যাডারের চিকিৎসকেরা।
স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, এই ক্যাডারে মোট ৫২৭টি পদ রয়েছে। ব্লক, মহকুমা ও জেলা স্তরে স্বাস্থ্য পরিষেবা পরিচালনা থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁদের। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক পদে কাজ করার সুবাদে সরকারি ব্যবস্থাপনা, কর্মী পরিচালনা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়।
দ্বিতীয় গোষ্ঠীতে রয়েছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিসের চিকিৎসকেরা। এঁরা মূলত মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক-চিকিৎসক। পড়ানোর পাশাপাশি রোগীও দেখেন। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, মেডিক্যাল সুপার কাম ভাইস প্রিন্সিপাল (এমএসভিপি) এবং অধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলিতে এই ক্যাডারের চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
স্বাস্থ্যভবনের যুক্তি, হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে এই চিকিৎসকদেরও প্রশাসনিক দক্ষতা তৈরি হয়। কর্মী পরিচালনা, পরিকাঠামোগত সিদ্ধান্ত, চিকিৎসা পরিষেবার সমন্বয় এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁরা যোগ্য হতে পারেন।
প্রাক্তন আমলাদেরও সমর্থন
স্বাস্থ্যভবনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব রাজীবা সিনহা। অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়েরও বক্তব্য, চিকিৎসকেরা যখন ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য দফতরে বিশেষ সচিবের মতো পদে পৌঁছতে পারছেন, তখন তাঁদের আইএএস হওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি কোথায়? তাঁর মতে, বহু ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের দক্ষতার সঙ্গে দফতর ও হাসপাতাল পরিচালনা করতে দেখা গিয়েছে। খাদ্য-সহ অন্যান্য সরকারি সার্ভিস থেকেও আধিকারিকেরা আইএএস হচ্ছেন। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ থাকা উচিত।
চিকিৎসক সংগঠন সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের রাজ্য সম্পাদক সজল বিশ্বাসও এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পৃথক ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস ক্যাডার তৈরির দাবি দীর্ঘদিনের। স্বাস্থ্যভবনের এই উদ্যোগ সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে শুধু প্রস্তাব পাঠিয়েই থেমে থাকলে চলবে না। দ্রুত যাতে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়, তার জন্য স্বাস্থ্যভবনকে উদ্যোগী হতে হবে।
এখন বল নবান্নের কোর্টে
প্রশাসনিক মহলে এই প্রস্তাব কার্যকর হলে তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এত দিন চিকিৎসকেরা মূলত স্বাস্থ্য পরিষেবা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যেই নিজেদের কর্মজীবনের সুযোগ খুঁজতেন। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তাঁদের সামনে আইএএস হওয়ার পথও খুলতে পারে। তবে স্বাস্থ্যভবনের চিঠি পাঠানো মানেই চিকিৎসকেরা এখনই আইএএস হয়ে যাবেন, এমন নয়।
নন-এসসিএস কোটার নিয়ম, যোগ্যতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট ক্যাডারগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে নবান্নের কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতরকেই। চিকিৎসকদের প্রশাসনিক দক্ষতাকে বৃহত্তর সরকারি ব্যবস্থায় কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কত দূর এগোয়, এখন সেদিকেই নজর। প্রস্তাবে নবান্নের সবুজ সঙ্কেত মিললে রাজ্যের চিকিৎসক মহলে তা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।




