নয়ডা: সপ্তাহের পাঁচ দিন ল্যাপটপের সামনে বসে কর্পোরেট চাকরি। আর শনি-রবিবার হলেই অন্য পরিচয়! তখন তাঁরা আর প্রোডাক্ট ম্যানেজার নন, হয়ে ওঠেন মাটনের দোকানের কারিগর ও উদ্যোক্তা। তাঁদের তৈরি একটি বিশেষ পদ চেখে দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন দিল্লি-এনসিআরের খাদ্যরসিকেরা। দোকান খোলার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে সমস্ত খাবার। এমনকি অনেককে টোকেন হাতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা সেই ব্যবসার নাম ‘লাহাম’। আর তার মূল আকর্ষণ ‘নমকিন গোশত’।
এই অভিনব উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন ২৬ বছরের ঋষভ কুমার এবং তাঁর বন্ধু শশিকান্ত সিংহ। দু’জনেই পেশায় প্রোডাক্ট ম্যানেজার। আগে বেঙ্গালুরুতে একই সংস্থায় কাজ করতেন তাঁরা। চলতি বছরে নয়ডায় চলে আসার পর পুরনো স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। খাবারের প্রতি ভালবাসা থেকেই ব্যবসা শুরুর ভাবনা। তবে বড় রেস্তরাঁ খোলার মতো পুঁজি ছিল না। তাই বেছে নেন ছোট্ট একটি ফুড কার্ট। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে কেনেন ঠেলা, আলো এবং রান্নার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। গত ৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে ‘লাহাম’।
মেনুতে মাত্র এক পদ, তাতেই হইচই
নয়ডার সেক্টর ৭৬-এর বাজার এলাকায় এই ফুড কার্টের বিশেষত্ব হল, এখানে একটিমাত্র পদ পাওয়া যায়—নমকিন গোশত। নামের মতোই রান্নার ধরনেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। ঝাল-মশলাদার গ্রেভি নয়, বরং অল্প মশলায় মাটনের নিজস্ব স্বাদ বজায় রেখেই রান্না করা হয় এই পদ। তার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ছোট ছোট মালাবার কয়েন পরোটা। উদ্দেশ্য, রাস্তায় দাঁড়িয়েই যাতে ক্রেতারা সহজে একটি সম্পূর্ণ খাবার খেতে পারেন।
‘লাহাম’ শব্দের অর্থ মাংস। ঋষভের তৈরি এই পদটির অনুপ্রেরণা পাকিস্তানের পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের জনপ্রিয় ‘লাহাম চারসি’। প্রথম বার হায়দরাবাদে এই পদ চেখে দেখেছিলেন ঋষভ। তার পর নিজেই রান্নার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রায় ন’বছর ধরে রান্না করছেন তিনি। বাবা-মায়ের কাছ থেকে যেমন শিখেছেন, তেমনই ইউটিউব দেখে এবং নানা রকম পরীক্ষা করে নিজের রান্নার দক্ষতা বাড়িয়েছেন।
দামও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যে। দু’টি পরোটা-সহ হাফ প্লেটের দাম ১৫৯ টাকা। চারটি পরোটা-সহ ফুল প্লেট ২৭৯ টাকা এবং ছ’টি পরোটা-সহ বড় প্লেটের দাম ৩৯৯ টাকা। মূল পদ শেষ হয়ে গেলে মিহি করে কাটা মাটন দিয়ে তৈরি গ্রেভিও পরিবেশন করা হয়।
প্রথম দিন ক্রেতা নেই, এখন তিন ঘণ্টাতেই ‘সোল্ড আউট’
শুরুটা অবশ্য এত মসৃণ ছিল না। প্রথম দিন দোকান খোলার পর প্রায় ১০ মিনিট কোনও ক্রেতাই আসেননি। নিজেদের খাবারের ধারণা বোঝাতে পথচলতি মানুষকে ডেকে ডেকে জানাতে হয়েছিল। প্রথম ক্রেতা ছিলেন এক ব্যক্তি। খাবার চেখে তাঁর এতটাই ভাল লাগে যে, একটি প্লেট শেষ করেই আরও একটি বড় প্লেটের অর্ডার দেন। তাতেই কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পান দুই বন্ধু।
প্রথম দিন বিক্রি হয়েছিল ২৫ প্লেট, পরের দিন ৩৫। শুরুতে আড়াই কেজি মাটন দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তাঁরা। এখন প্রতি সপ্তাহান্তে প্রায় ২৫ কেজি মাটন রান্না করা হচ্ছে। চাহিদা এমনই যে, সন্ধ্যায় দোকান খোলার তিন ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক ক্রেতাকে খাবারের জন্য ৪৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। টোকেন নম্বর ধরে ক্রেতাদের খাবার দেওয়া হয়। এক দিন তো খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় এক খুদে ক্রেতার মন খারাপ দেখে উদ্যোক্তারাও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।
ব্যবসা শুরুর প্রথম মাসেই প্রায় ৬ লক্ষ টাকার বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঋষভ। তবে এই অঙ্ক পুরোটাই ব্যবসার আয়, ব্যক্তিগত লাভ নয়। উপার্জনের বড় অংশই আবার ব্যবসার পরিকাঠামো ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
অনুমতি না মেলায় ২০ কেজি মাটন নিয়ে বিপাকে
ব্যবসার পথে বাধাও এসেছে। প্রথমে শশিকান্তের ভাড়া ফ্ল্যাটে রান্নার প্রস্তুতি চলত। কিন্তু বাড়িওয়ালার আপত্তিতে সেই ব্যবস্থা বন্ধ করতে হয়। পরে ক্লাউড কিচেনের সাহায্য নেন তাঁরা। এক সপ্তাহান্তে ২০ কেজি মাটন রান্নার প্রস্তুতি নেওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টায় খবর আসে, প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকায় সে দিন ঠেলা বসানো যাবে না। এত মাটন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়েননি দুই বন্ধু। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া শুরু করেন। পরে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দিয়ে ক্রেতাদের খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। তাতেও সমস্ত খাবার বিক্রি হয়ে যায়। বর্তমানে একটি বেসরকারি জায়গায় ঠেলা বসাচ্ছেন তাঁরা, যাতে অনুমতি সংক্রান্ত সমস্যা এড়ানো যায়।
বোন সামলাচ্ছেন রান্নাঘর, বন্ধুরা ভাগ করে নিয়েছেন দায়িত্ব
‘লাহাম’-এর পিছনে রয়েছে ছোট্ট একটি দল। ঋষভ রান্না, খাবারের মান, বিপণন ও সামাজিক মাধ্যমের বিষয়গুলি দেখেন। শশিকান্ত সামলান অর্থ, কেনাকাটা এবং পরিচালনার দায়িত্ব। ঋষভের বোন প্রিয়াঙ্কা রান্নার প্রস্তুতি ও রান্নাঘরের বড় অংশের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের ছোটবেলার বন্ধু অর্পিত সিংহ দেখেন পরিচালনার কাজ। কলেজের বন্ধু রচিত সামলান বিলিং। প্রয়োজনে আরও কয়েক জন বন্ধু ও সহকর্মী খাবার তৈরি এবং প্যাকেট করার কাজে সাহায্য করেন।
দুর্গাপুজোর সময় একাধিক পুজো মণ্ডপে খাবারের স্টল বসানোর সুযোগ আসে। দিল্লির বড় খাদ্য উৎসব ‘হর্ন ওকে প্লিজ়’-এও আমন্ত্রণ পেয়েছিল ‘লাহাম’। কিন্তু সমস্যা ছিল, সপ্তাহের কর্মদিবসে দু’জন প্রতিষ্ঠাতা অফিসে থাকেন। সেই সময় রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলেছেন প্রিয়াঙ্কা।
৫ কোটি টাকার মূল্যায়ন, তবু বিনিয়োগ নিতে নারাজ
ব্যবসার জনপ্রিয়তা দেখে এক বিনিয়োগকারী ‘লাহাম’-এর মূল্যায়ন ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন। সংস্থার এক কোটি টাকার শেয়ার কেনার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন ঋষভ ও শশিকান্ত। আপাতত বাইরের বিনিয়োগ ছাড়াই নিজেদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তাঁরা।
আগামী তিন বছরে একাধিক ফুড কার্ট চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। দিল্লি-এনসিআর ছাড়াও ঋষভের নিজের শহর গোরক্ষপুরে ব্যবসা ছড়িয়ে দিতে চান তাঁরা। পরে ফুড কার্ট থেকে কিয়স্ক, আর শেষ পর্যন্ত একটি ফাইন ডাইনিং রেস্তরাঁ গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে। ভবিষ্যতে মেনুতে মুরগির মাংস, লাল মাস কিংবা ঘি রোস্টের মতো পদও যুক্ত হতে পারে। তবে প্রতিটি পদেই একই মান বজায় রাখার শর্ত রেখেছেন তাঁরা।
এত সাফল্যের পরেও এখনই চাকরি ছাড়তে চান না দুই বন্ধু। ঋষভের বক্তব্য, ব্যবসার খরচ চালানোর জন্য আপাতত চাকরির আয় প্রয়োজন। সপ্তাহান্তে রাত দুটো পর্যন্ত কাজ করে আবার সকাল সাতটা-আটটার মধ্যে রান্নার প্রস্তুতিতে নেমে পড়তে হয় তাঁদের। বিশ্রাম, বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—সবই আপাতত পিছনের সারিতে।
কর্পোরেট চাকরির পাশাপাশি নিজের স্বপ্নের ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই লড়াইয়েই আপাতত মজে দুই বন্ধু। ৩৫ হাজার টাকার ছোট্ট উদ্যোগ যে প্রথম মাসেই ৬ লক্ষ টাকার ব্যবসায় পৌঁছে যেতে পারে, নয়ডার ‘লাহাম’ তারই নজরকাড়া উদাহরণ।




