রাজনীতিতে অতীত যেন এক অদ্ভুত আয়না। আজ যা বর্তমানের অস্ত্র, কাল তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের পাতা। বাংলার রাজনীতিতে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে পাঁচ দশকেরও বেশি পুরনো এক অধ্যায়—১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূল বা বিরোধীদের নির্বাচন কমিশন এবং ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আক্রমণ করার সময় এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। সম্প্রতি বিজেপি সাংসদ নিশীকান্ত দুবে কংগ্রেসকে বিঁধতে টেনে এনেছেন ১৯৭২ সালের সেই বিতর্কিত নির্বাচনকে, যেখানে সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ ছিল যে, তৎকালীন শাসক দল কংগ্রেস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বড়সড় কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে সেই নির্বাচন ঘিরে কী এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে, যা আজও রাজ্য রাজনীতিতে তর্কের খোরাক জোগায়?
অপ্রত্যাশিত ফলাফল এবং ভোটের অঙ্ক
১৯৭২ সালের মার্চ মাসের বিধানসভা নির্বাচনের ফল কেবল রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদেরই নয়, খোদ রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন রাজনৈতিক আবহাওয়ায় কংগ্রেসের জয় প্রত্যাশিত হলেও, সেই জয়ের ব্যবধান ছিল কল্পনার বাইরে। ২৮০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেস একাই জিতেছিল ২১৬টি আসনে! তাদের জোটসঙ্গী সিপিআই পেয়েছিল ৩৫টি আসন। অথচ ঠিক তার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের নির্বাচনে ১১৩টি আসনে জয়ী হওয়া শক্তিশালী সিপিআই(এম) এক ঝটকায় নেমে আসে মাত্র ১৪টি আসনে!
তবে এই বিপুল আসন সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অন্য এক রাজনৈতিক সমীকরণ। সে সময় ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’ (Economic and Political Weekly)-তে লেখা এক নিবন্ধে বিশিষ্ট বাম নেতা ও অর্থনীতিবিদ বিপ্লব দাশগুপ্ত তুলে ধরেছিলেন অন্য চিত্র। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, কংগ্রেসের এই জয় তাদের প্রকৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন নয়। সিপিআই(এম) সেবারও প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, যা ১৯৭১ সালের কংগ্রেসের ২৯ শতাংশ ভোটের খুব কাছাকাছি। বিপ্লব দাশগুপ্তের হিসাব অনুযায়ী, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন ভাগ হলে সিপিআই(এম)-এর পাওয়ার কথা ছিল অন্তত ৭৮টি আসন, সেখানে মাত্র ১৪টিতে তাদের আটকে দেওয়া হয়। বামফ্রন্ট প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পেয়েছিল মাত্র ২০টি। ভোটের শতাংশ এবং প্রাপ্ত আসনের এই আকাশচুম্বী ফারাকই সে সময় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।
‘ভোট লুঠ, সন্ত্রাস আর বুথ দখলের’ উপাখ্যান
তৎকালীন সময়ে সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ ছিল, সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছিল। বুথ দখল, ভোটারদের ভয় দেখানো, বাধা দেওয়া, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমার ব্যবহার এবং ভোটগণনা বিকৃত করার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল বামেরা। নির্বাচন দোরগোড়ায় পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক হিংসা। বাম কর্মীদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক কারণে পরিবারগুলির বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং বিরোধীদের নিশানা করার মতো ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছিল।
যে লেখায় বাংলা আজও নিঃশব্দে বেঁচে আছে
বর্তমান সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রবিন দেব, যিনি সে সময় মাত্র ২৩ বছরের তরুণ, তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, শিয়ালদহ এলাকায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের কাছে কংগ্রেস কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি। tram থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধরের জেরে গুরুতর জখম হয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় রবিন দেবের স্মৃতিতে আজও টাটকা, Baranagar কেন্দ্রে সিপিআই(এম)-এর বর্ষীয়ান নেতা ও প্রার্থী জ্যোতি বসুর নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত। ব্যাপক ভোট লুঠের দৃশ্য চোখের সামনে দেখার পরই জ্যোতিবাবু নিজের প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নেন বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, প্রচারের সময় পুলিশের লাঠিচার্জ ও হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু বাম কর্মী। অনেক এলাকায় বিরোধী ভোটারদের লাইনে দাঁড়াতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড ও বামেদের বয়কট
নির্বাচন কমিশনের সরকারি নথিতেও সে সময় কলকাতার আশেপাশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গণ্ডগোল এবং রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার কথা স্বীকার করা হয়েছিল। তবে বিরোধীদের লাগাতার কারচুপির অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশনের কাছে সরাসরি ভোটারের বাধা পাওয়ার লিখিত অভিযোগ তুলনামূলক কম জমা পড়েছিল বলে জানানো হয়।
তা সত্ত্বেও ভোটের সার্বিক পরিবেশ যে কতটা অশান্ত ও সংঘাতপূর্ণ ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ফলাফলকে ‘গণতন্ত্রের হত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে সিপিআই(এম) এবং বিরোধী দলগুলি বিধানসভা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের শাসনকালকে তারা ‘অর্ধ-ফ্যাসিবাদী দখলদারি’ (Semi-fascist takeover) বলে আখ্যায়িত করেছিল।
প্রেক্ষাপট: অস্থিরতা ও পরিবর্তনের দশক
১৯৭২ সালের এই উত্তাল নির্বাচন আচমকা আসেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলায় কংগ্রেসের আধিপত্য থাকলেও ষাটের দশকে দলের অন্দরের ভাঙন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানে সেই ভিত নড়বড়ে হতে শুরু করে। কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় বাংলা কংগ্রেস, অন্যদিকে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়ে জন্ম নেয় সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এর। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে বারবার সরকার বদল, কোয়ালিশন সরকারের অস্থিরতা এবং চরম রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গ। অবশেষে ১৯৭২-এর বিতর্কিত নির্বাচনের হাত ধরে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে রাজ্যে কংগ্রেস পূর্ণ মেয়াদের সরকার গঠন করলেও, সেই নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্থায়ী ক্ষত ও বিতর্কের দাগ রেখে গেছে।
আজকের রাজনীতিতে অতীত কেন প্রাসঙ্গিক?
আজ দশকের পর দশক কেটে যাওয়ার পর, যখন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজা চরমে, ঠিক তখনই বিজেপি কর্তৃক ১৯৭২ সালের প্রসঙ্গটি পুনরুত্থাপন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বামেদের দীর্ঘদিনের সেই পুরনো অভিযোগকে সামনে এনে বিজেপি যেমন বর্তমান বিরোধীদের দিকেই আঙুল তুলছে, তেমনই ঘুরপথে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরনো অন্ধকার দিকগুলোকে ফের জাস্টিফাই বা তুলনামূলক আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসছে। ইতিহাসের পাতা থেকে বেরিয়ে আসা ১৯৭২-এর এই ছায়া প্রমাণ করে—বাংলার রাজনীতিতে ভোট, ব্যালট, আর ক্ষমতার লড়াইয়ের সংঘাত কেবল বর্তমানের নয়, এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে বহু পুরনো রাজনৈতিক ময়দানে।




