কলকাতা, নিউজ ডেস্ক : ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্প শুরু হয়েছে তিন মাস আগে। পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় গোটা একটি ত্রৈমাসিক। অথচ এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১ কোটি ২৯ লক্ষ জবকার্ডধারীর মধ্যে কাজ পেয়েছেন মাত্র ২ লক্ষ ৬৭ হাজার জন। অর্থাৎ, সরকারি নথিতে নাম থাকা প্রায় ১ কোটি ২৬ লক্ষ গ্রামীণ শ্রমিক এখনও এই প্রকল্পের কাজের সুযোগ পাননি। পুজোর মুখে কাজের আশায় থাকা বিপুল সংখ্যক পরিবারের কাছে এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
শুধু কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রেই সমস্যা নয়। যে অল্প সংখ্যক শ্রমিক কাজ পেয়েছেন, তাঁদের একাংশের মজুরিও এখনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছয়নি। একাধিক জেলা প্রশাসনের তরফে বকেয়া মজুরি মেটানোর বিষয়ে রাজ্যকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের ব্যাখ্যা, কেন্দ্রীয় অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি জবকার্ডধারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর হারও অত্যন্ত কম। ‘ডিবিটি স্পর্শ’ এবং ‘এসএনএ স্পর্শ’-এর মতো কেন্দ্রীয় টাকা স্থানান্তর ব্যবস্থার জটিলতা মজুরি পৌঁছনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মজুরি পাওয়ার হার মাত্র ০.৯৯ শতাংশ।
তবে সমস্যা শুধু টাকা পৌঁছনোর ব্যবস্থায় নয়। কাজ তৈরি এবং মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন নিয়েও জটিলতা রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে দাবি। দীর্ঘদিন আগের ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকার পরে নতুন প্রকল্প চালু হয়েছে। তার উপর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব তৃণমূল স্তরের পঞ্চায়েত ব্যবস্থাতেও পড়েছে বলে রাজ্যের ব্যাখ্যা। ফলে প্রকল্পের আওতায় কী কাজ হবে, কোন কোন পরিকাঠামো তৈরি করা হবে—তার পরিকল্পনা থাকলেও মাঠে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে গতি আসছে না।
এই পরিস্থিতি বদলাতে ‘কনভারজেন্স’-এর উপর জোর দিচ্ছে রাজ্য পঞ্চায়েত দপ্তর। অর্থাৎ, শুধু পঞ্চায়েতের নিজস্ব উদ্যোগে নয়, অন্যান্য দপ্তরের প্রকল্পের সঙ্গেও সমন্বয় করে ১২৫ দিনের কাজের আওতায় শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নতুন একটি পোর্টাল আনার উদ্যোগ হয়েছে। সেখানে কোনও এলাকার স্থায়ী পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ মতামত বা প্রস্তাব দিতে পারবেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদেরও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে পঞ্চায়েত স্তরে কোনও কাজের প্রস্তাব আটকে থাকলেও এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রকল্পের তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছবে বলে মনে করছে রাজ্য। পরে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পঞ্চায়েত স্তরে সেই কাজ অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোবে। প্রশাসনের লক্ষ্য, প্রকল্পের গতি বাড়িয়ে আরও বেশি সংখ্যক জবকার্ডধারীকে কাজের আওতায় আনা।
রাজ্যের পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিকের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। তাঁর দাবি, ধাপে ধাপে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে প্রত্যেককে কাজ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের প্রথম সারিতে থাকবে।
কিন্তু আপাতত সরকারি পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। ১ কোটি ২৯ লক্ষ জবকার্ডধারীর রাজ্যে তিন মাসে কাজ পেয়েছেন মাত্র ২ লক্ষ ৬৭ হাজার। ফলে ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্পের প্রথম তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বাইরে রয়ে গিয়েছেন বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ শ্রমিক। পুজোর আগে সেই সংখ্যাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
