দিল্লির সংসদ চত্বর থেকে ফের সরব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হালিশহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়ে হামলার অভিযোগ ঘিরে সোমবার রাজ্য সরকার এবং বিজেপিকে একযোগে নিশানা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অভিযোগ, রবিবারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনও রাজনৈতিক গোলমাল নয়, বরং এর পিছনে রয়েছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদত। বিরোধীদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলতেই পরিকল্পিত ভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁর। প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘মদত’ ছাড়া এই ধরনের হামলা চালানোর সাহস কেউ পেত না বলেও তোপ দাগেন তিনি।
হালিশহরের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে অভিষেকের দাবি, মমতার কনভয়কে লক্ষ্য করে যে ভাবে ইট, পাথর এবং কাদা ছোড়া হয়েছে, তার ফুটেজই যথেষ্ট। তাঁর বক্তব্য, ‘‘প্রশাসনিক মদত ছাড়া এই ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়।’’ ঘটনার সময়ে সেখানে উপস্থিত কয়েক জনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। অভিষেকের দাবি, ওই ব্যক্তিদের কয়েক জনকে অতীতে বিজেপির প্রার্থীর হয়ে প্রচারে দেখা গিয়েছে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁদের ছবিও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রয়োজনে সেই ছবি ও তথ্য প্রকাশ্যে আনার কথাও বলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।
এই সূত্রেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করেন অভিষেক। গত ১৯ জুনের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তাঁর দাবি, লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক সেরে কলকাতা বিমানবন্দরে ফেরার সময়ে তিনি এক ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখেছিলেন। অভিষেকের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়নি। কেন পুলিশ এত দিনেও তাঁকে ধরতে পারেনি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
অভিষেকের আরও দাবি, ওই ব্যক্তির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি রয়েছে। সেই সূত্র ধরে তাঁর কটাক্ষ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর হাত মাথার উপর রয়েছে বলেই বিমানবন্দরে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ানো লোকটিকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।’’
হালিশহরের ঘটনাকে সামনে রেখে রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির পরিসর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলকে রাজনৈতিক কর্মসূচি করার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, সভার অনুমতিও দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর কথায়, শাসক শিবির তৃণমূলকে রাজনৈতিক ভাবে ভয় পাচ্ছে। মমতার কনভয়ে হামলার ঘটনাকে তিনি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই অংশ বলে ব্যাখ্যা করেন।
একই সঙ্গে বিজেপির পাশাপাশি রাজ্যের অন্য বিরোধী দলগুলিকেও আক্রমণ করেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, গত দু’মাসে তথাকথিত বিরোধীদের বিজেপি বা সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সরব হতে দেখা যায়নি। বরং তৃণমূল, মমতা এবং তাঁকেই নিশানা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অভিষেকের কথায়, ‘‘তারা কোনও প্রশ্ন তোলে না, সাংবাদিক বৈঠক করে না। বরং ২৪ ঘণ্টা তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আমাকে নিশানা করে চলেছে।’’
তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়কদের দলবদল করানোর অভিযোগ নিয়েও এ দিন সরব হন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি এবং তাদের সহযোগী শক্তি মিলে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করার চেষ্টা করছে। গত কয়েক মাসে রাজ্যের মানুষ তাঁদের ভূমিকা দেখেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে হালিশহরের ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই এখন বড় প্রশ্ন তদন্ত নিয়ে। সত্যিই কি হামলার পিছনে কোনও রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল? হামলাকারীদের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের যোগ রয়েছে কি না? প্রশাসনের কোনও স্তর থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত দেওয়া হয়েছিল কি না? নাকি ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘর্ষেরই বহিঃপ্রকাশ? সেই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।
অভিষেক অবশ্য এ দিন দিল্লি থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—হালিশহরের ঘটনাকে তাঁরা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন হামলা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর অভিযোগ, এর পিছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিজেপি এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর সেই অভিযোগের পাল্টা জবাব কী আসে, এখন সেটাই দেখার। কারণ হালিশহরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র হচ্ছে শাসক-বিরোধী সংঘাতের সুর।