পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই দলের অন্দরে আত্মসমালোচনা, ভাঙন, নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং সংগঠন পুনর্গঠন নিয়ে জোর চর্চা চলছে। এই আবহেই দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্রদের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, এটি কি শুধুই ছাত্রদের প্রতি সংহতি, নাকি বাংলায় পরাজয়ের পর জাতীয় রাজনীতির ঘোলা জলে নতুন করে মাছ ধরার কৌশল?
দিল্লির যন্তর মন্তরে গত কয়েক দিন ধরে শিক্ষা, নিয়োগ এবং পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সিজেপি। বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন মুখ সেখানে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন। সেই তালিকায় এ বার যোগ হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও। দলীয় সূত্রের দাবি, ছাত্র-যুবদের পাশে দাঁড়ানোই এই সফরের একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা।
বাংলায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর পরাজয় তৃণমূলের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা। সেই পরাজয়ের পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে দলের প্রভাব আগের মতো নেই। ফলে জাতীয় স্তরে বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখে প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে তৃণমূল— এমন ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তাঁদের মতে, দিল্লির আন্দোলনের মঞ্চ মমতার কাছে সেই সুযোগ এনে দিতে পারে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলের দাবি, ছাত্রদের দাবি-দাওয়া কোনও রাজ্যের সীমানায় আটকে থাকে না। তাই যে কোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো বিরোধী দলের দায়িত্ব। মমতার এই সফরকে রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের অঙ্কে না দেখার আবেদনও জানিয়েছে তৃণমূল।
তবে বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই কটাক্ষ শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, বাংলার মানুষের রায়ে ক্ষমতা হারানোর পর এখন জাতীয় ইস্যুকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক জমি খুঁজছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্র আন্দোলনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর থেকে তাত্ক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ না হলেও জাতীয় বিরোধী রাজনীতিতে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার সুযোগ পাবেন তৃণমূল নেত্রী। একই সঙ্গে দিল্লির আন্দোলনের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ভবিষ্যতের বিরোধী জোট রাজনীতির সমীকরণেও নতুন বার্তা দিতে পারে।
এখন নজর সোমবারের দিকে। যন্তর মন্তরের ধর্নামঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী বার্তা দেন, ছাত্র আন্দোলনকে কীভাবে সমর্থন করেন এবং সেই বক্তব্য জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে— তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা। বাংলার পরাজয়ের পর দিল্লির এই সফর শুধুই সংহতির রাজনীতি, নাকি নতুন রাজনৈতিক ইনিংসের সূচনা— সেই উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই।