এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে ঘিরে একটি রাজনৈতিক ধারণা প্রায় অটুট ছিল— যত বড় বিতর্কই হোক, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। বিরোধীদের আন্দোলন, সংসদের অচলাবস্থা কিংবা জনরোষ— কোনও কিছুরই প্রভাব পড়েনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায়। কিন্তু শনিবার সেই ধারণাতেই বড় ধাক্কা লাগল। নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসকে ঘিরে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের জেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে ইস্তফা জমা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০১৪ সালে এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলেন তিনি।
এই ঘটনাকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে ২০১৫ সালের একটি মন্তব্য। সে বছর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বলেছিলেন, "এনডিএ সরকারের কোনও মন্ত্রীর ইস্তফা হবে না।" দীর্ঘদিন ধরে এই মন্তব্যকে মোদী সরকারের রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছিল। শনিবার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।
এম জে আকবরের পর দ্বিতীয়
মোদী সরকারের ১১ বছরের ইতিহাসে এর আগে একমাত্র এম জে আকবরকেই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল। ২০১৮ সালে 'মি টু' আন্দোলনের সময় সাংবাদিক প্রিয়া রমানি তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলেন। বিতর্কের জেরে বিদেশ প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়েন আকবর। তারপর দীর্ঘ আট বছরে আর কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়নি। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম।
ছাত্র আন্দোলনের চাপে ইস্তফা
গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র নেতৃত্বে নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। পরে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকও অনশনে সামিল হন। সংসদ অভিযানকে ঘিরে উত্তেজনা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং লাগাতার বিক্ষোভের আবহে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা আগে সমাজমাধ্যম এক্স-এ দীর্ঘ পোস্ট করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সেখানে তিনি লেখেন, গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। "নিট প্রশ্নফাঁসের দায় আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের কাঁধে নিয়েছি," লিখেছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর আবেদন, যন্তর মন্তরের আন্দোলন এবং বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ যেন কোনও 'দেশবিরোধী শক্তি' নিতে না পারে।
'গণতন্ত্রের জয়', বলছে বিরোধীরা
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে বিরোধীরা ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কংগ্রেস, সিজেপি এবং ২৬ দিনের অনশন ভাঙা সোনম ওয়াংচুক— সকলেই একে "গণতন্ত্রের জয়" বলে দাবি করেছেন।
কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে বলেন, "দেশের ছাত্রদের কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দরজায় পৌঁছেছে। শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষার লড়াইয়ে কোটি কোটি যুবকের এটি জয়। এটি সত্যের জয় এবং মোদী সরকারের একগুঁয়েমির পরাজয়।"
তাঁর আরও দাবি, এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছাত্রসমাজের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। পাশাপাশি, আন্দোলনকারীদের উপর লাঠিচার্জ, ব্যাটন এবং পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা তাঁদের ৩৬ দিনের আন্দোলনের প্রথম জয়। তবে আন্দোলন এখানেই শেষ হচ্ছে না। তাঁদের বাকি দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে— নিট প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা ছাত্রছাত্রীদের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি প্রত্যাহার।
বিজেপির বার্তা— 'এটি দায়বদ্ধতার নজির'
বিরোধীরা যেখানে এই ইস্তফাকে সরকারের পরাজয় হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিজেপি নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, "সত্যিকারের নেতৃত্বের মূল্যায়ন হয় দীর্ঘ জনজীবনের অবদানে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবন ছাত্রকল্যাণ ও জনসেবার প্রতি আজীবন অঙ্গীকারের প্রমাণ।"
বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বিনোদ তাওড়ে বলেন, "একটি শক্তিশালী দেশের ভিত্তি তার শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ধর্মেন্দ্র প্রধান সবসময় শিক্ষাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার চেষ্টা করেছেন।" তিনি 'বিকশিত ভারত ২০৪৭'-এর লক্ষ্যে ভবিষ্যতের জন্য ধর্মেন্দ্রকে শুভেচ্ছাও জানান।
বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারি আবার দাবি করেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ আসলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংবেদনশীল নেতৃত্বের প্রতিফলন। তাঁর কথায়, "ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে কোনও পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত সরকার। এই পদত্যাগ তারই প্রমাণ।"
এদিকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনও ধর্মেন্দ্রর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, "বৃহত্তর স্বার্থে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধান জনজীবনে সততা ও নিঃস্বার্থ সেবার সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। দল তাঁর পাশে রয়েছে।" একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি ২০২০) বাস্তবায়ন-সহ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ শুধু একজন মন্ত্রীর বিদায় হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, এটি মোদী সরকারের এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনে বিরল রাজনৈতিক ঘটনা। একই সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের শক্তি, বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ চাপ এবং সরকারের রাজনৈতিক হিসাব— এই তিনের সংঘাতে তৈরি হওয়া নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত বহন করছে এই পদত্যাগ। আগামী দিনে এই ঘটনার অভিঘাত সংসদ থেকে রাজপথ— দুই ক্ষেত্রেই অনুভূত হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।