বাঁচার মরিয়া চেষ্টা। একবার এদিক, একবার ওদিক। নিচে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের উৎকণ্ঠা, উদ্ধারকর্মীদের অসহায় অপেক্ষা। আর প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু বিদ্যুতের খুঁটির মাথায় বসে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিল একটি কালো ভালুক। সকলের প্রার্থনা ছিল— কোনও ভাবে যেন নিরাপদে নিচে নেমে আসে সে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। নামার চেষ্টা করতেই উচ্চ ভোল্টেজের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হল ভালুকটির।
ঘটনাটি ঘটেছে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের গ্ল্যাডস্টোন এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে দূর থেকে বিদ্যুতের খুঁটির মাথায় একটি কালো অবয়ব দেখতে পান। কাছে যেতেই বোঝা যায়, সেটি একটি পূর্ণবয়স্ক কালো ভালুক। কী ভাবে সে এত উঁচু বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বন দফতরের অনুমান, আশপাশে ঘুরতে গিয়ে গাছ ভেবে খুঁটিতে উঠে পড়েছিল প্রাণীটি। কিন্তু ওপরে ওঠার পর আর নামার নিরাপদ পথ খুঁজে পায়নি।
মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। রাস্তার ধারে ভিড় জমাতে শুরু করেন কৌতূহলী মানুষ। কেউ মোবাইলে সেই দৃশ্য বন্দি করছেন, কেউ আবার আতঙ্কে চোখ ফেরাতে পারছেন না। বিদ্যুতের খুঁটির সরু ক্রস-আর্ম আঁকড়ে ধরে কখনও বসে পড়ছে, কখনও আবার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে ভালুকটি। যেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল সে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন নিউ মেক্সিকো গেম অ্যান্ড ফিশ বিভাগের কর্মীরা। বিদ্যুৎ দফতরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। ভালুকটিকে অজ্ঞান করার কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসেন উদ্ধারকারীরা। কারণ, ট্রাঙ্কুলাইজার লাগার পর ভালুকটি যদি খুঁটির উপর থেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়ত, তা হলে প্রায় ৩৫ ফুট নিচে আছড়ে পড়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।
দীর্ঘক্ষণ পর ভালুকটি নিজেই নামার চেষ্টা শুরু করে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের চোখে তখন আশার আলো। কেউ কেউ চিৎকার করে ওঠেন, "ও নেমে আসছে!" কিন্তু সেই আশার আলো নিভে যেতে সময় লাগেনি।
খুঁটি বেয়ে নামার সময় আচমকাই একটি উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে চলে আসে ভালুকটি। মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দ, আগুনের ঝলকানি— তারপরই নিথর হয়ে যায় প্রাণীটি। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ সেই দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন। কেউ চোখ ঢেকে ফেলেন, কেউ আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় একটি নিরীহ বন্যপ্রাণের জীবন।
এই ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বহু নেটিজেনের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ করে বা অন্য কোনও প্রযুক্তির সাহায্যে কি ভালুকটিকে উদ্ধার করা যেত না? আবার অনেকের মতে, পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে উদ্ধারকারীদের হাতও কার্যত বাঁধা ছিল।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের বসতি ক্রমশ জঙ্গলের আরও কাছে চলে আসায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বেড়েই চলেছে। খাবারের খোঁজে বা ভয়ে পালাতে গিয়ে ভালুকের মতো প্রাণীরা প্রায়ই জনবসতিতে ঢুকে পড়ে। কখনও গাছে, কখনও বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে বিপদের মুখে পড়ে তারা। নিউ মেক্সিকোর এই ঘটনাও সেই বাস্তবতারই এক নির্মম স্মারক— যেখানে শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু অসহায় দর্শক হয়ে রইল, আর বাঁচার শেষ লড়াইটুকুও হেরে গেল একটি নিরীহ কালো ভালুক।