দেশের মাটিতে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ। সেখান থেকে বিদেশের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার অভিযোগ। তার পর লক্ষ্য—আফগানিস্তানে পৌঁছে প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামা! পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অবশ্য পুলিশের জালে ধরা পড়ল পশ্চিমবঙ্গের এক যুবক। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বেঙ্গালুরু পুলিশের এই গ্রেফতারি ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, ২৫ বছরের আসফুল মালিকের সঙ্গে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-র যোগাযোগ ছিল এবং তিনি পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।
বাংলার যুবক, বেঙ্গালুরুতে নিরাপত্তারক্ষী
পুলিশ সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা আসফুল বেঙ্গালুরুর বোম্মাসন্দ্র শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন। সেখানেই তাঁর গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় তদন্তকারীদের। অভিযোগ, স্বাভাবিক চাকরির আড়ালেই চলছিল অন্য এক যোগাযোগের পর্ব। অনলাইনে বিদেশে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র ধরেই তদন্ত এগোয়।
পুলিশের দাবি, ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যেই আফগানিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল। টিটিপি-র সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা ওই ব্যক্তির মাধ্যমে জঙ্গি নেটওয়ার্কে ঢোকার চেষ্টা হয়েছিল কি না, এখন সেটিই খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ফেসবুক থেকে আফগানিস্তান—কী ভাবে তৈরি হল যোগাযোগ?
তদন্তকারীদের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আফগানিস্তানে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে আসফুলের পরিচয় হয়। সেই যোগাযোগ ধীরে ধীরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পুলিশের বক্তব্য, ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তার সূত্রেই আফগানিস্তানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর।
শুধু মুখের কথা নয়, আফগানিস্তানে যাওয়ার জন্য ভিসার চেষ্টা পর্যন্ত করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। অর্থাৎ বিষয়টি নিছক অনলাইন আলাপচারিতায় আটকে ছিল, নাকি বাস্তবে বিদেশে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল—তার উত্তর খুঁজছে তদন্ত।
লক্ষ্য পাকিস্তান সেনা?
পুলিশের দাবি আরও চাঞ্চল্যকর। তদন্তকারীদের বক্তব্য, আসফুলের কথাবার্তায় পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভের ইঙ্গিত মিলেছে। সেই ক্ষোভ থেকেই টিটিপি-র সঙ্গে যোগাযোগ এবং পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টিটিপি পাকিস্তানকেন্দ্রিক একটি সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন। ফলে ভারতের এক যুবকের ওই সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগকে সাধারণ অনলাইন যোগাযোগ হিসেবে দেখছেন না তদন্তকারীরা। বরং এর পিছনে কোনও বড় নেটওয়ার্ক বা ‘রিক্রুটমেন্ট’ প্রক্রিয়া কাজ করছিল কি না, সেটাই এখন তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
আফগানিস্তানে পৌঁছতে পারেননি কেন?
পুলিশি জেরায় আসফুল জানিয়েছেন বলে তদন্তকারীদের দাবি, আফগানিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। আর্থিক সমস্যা এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি পিছিয়ে এসেছিলেন বলে খবর।
কিন্তু তদন্তকারীদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়—যদি যাওয়ার পরিকল্পনা সত্যিই থেকে থাকে, তবে কার সাহায্যে তিনি সেখানে পৌঁছতে চেয়েছিলেন? কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল? যাঁর সঙ্গে অনলাইনে কথা বলতেন, তাঁর পরিচয় কতটা নিশ্চিত? এবং আফগানিস্তানে পৌঁছনোর পরে তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই ডিজিটাল যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘দেশের ভিতরে’ কোনও হামলার ছকও ছিল?
তদন্তে উঠে আসা আর একটি বিষয় নিয়েও সতর্ক পুলিশ। অভিযোগ, অনলাইন কথোপকথনে ভারতের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। দেশে মুসলিমদের উপর ‘অন্যায়’ হলে তার প্রতিশোধ নেওয়ার মতো কথাবার্তা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনও তথ্য নেই যে আসফুল কোনও হামলা চালিয়েছেন বা নির্দিষ্ট কোনও হামলার জন্য অস্ত্র, বিস্ফোরক কিংবা অন্য কোনও সরঞ্জাম জোগাড় করেছিলেন। তাই পুলিশের অভিযোগ ও সন্দেহ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ—দুটিকে আলাদা করে দেখাই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গ্রেফতার, নাকি বড় নেটওয়ার্কের সূত্র?
তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আসফুল একাই এই যোগাযোগের মধ্যে ছিলেন, নাকি তাঁর সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত। তাঁর মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, কল রেকর্ড এবং অনলাইন যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর। আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে থাকা কোনও ব্যক্তি তাঁকে সরাসরি নির্দেশ দিতেন কি না, কিংবা ভারতে আরও কাউকে একই ভাবে যোগাযোগের আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছিল কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে বেঙ্গালুরু পুলিশের এই পদক্ষেপ তাই শুধু এক যুবকের গ্রেফতারি নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার আড়ালে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ‘রিক্রুটমেন্ট’ নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয় হতে পারে, সেই পুরনো আশঙ্কাকেও সামনে এনে দিল। তবে তদন্ত এখনও চলছে।