ধর্মতলার ছাত্র আন্দোলনের রেশ এবার পৌঁছে গেল বিধানসভার অন্দরে। শিক্ষায় দুর্নীতি ও নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে ডাকা মিছিল ঘিরে শুক্রবারের অশান্তির পর কড়া অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। শনিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করলেন, ধর্মতলার ঘটনায় মোট ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দায়ের হয়েছে সাতটি মামলা। আর সেই সব মামলাতেই প্রথম বার যুক্ত করা হয়েছে সদ্য পাস হওয়া ‘গুন্ডাদমন আইন’। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, “এমন শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে এক দিন নয়, তিন পুরুষ মনে রাখে।”
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে উঠে শুভেন্দু বলেন, আন্দোলনের নামে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল। পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ মিছিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই কারণেই বাহিনীকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, আন্দোলনকারীদের একাংশ বারবার পুলিশকে উসকানি দিলেও বাহিনী কোনও অবস্থাতেই বলপ্রয়োগের পথে হাঁটেনি।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিংয়ে পৌঁছতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রথমে পুলিশের দিকে জলের বোতল ও জুতো ছোড়া শুরু হয়। পরে হামলার মুখে পড়েন ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত সাংবাদিকরা। শুভেন্দুর কথায়, “ওদের উদ্দেশ্য ছিল পুলিশকে লাঠিচার্জে বাধ্য করা। কাঁদানে গ্যাস ছোড়ানো বা বলপ্রয়োগ করানো। তারপর সেই ছবি দেখিয়ে রাজনৈতিক নাটক তৈরি করা। কিন্তু পুলিশ সেই ফাঁদে পা দেয়নি।”
এই ঘটনায় ছয় জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও বিধানসভায় জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা করে শুভেন্দু বলেন, “গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের উপর হামলা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই বড় অগ্রগতির দাবি করেছে প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, হেয়ার স্ট্রিট থানায় ছ'টি এবং এন্টালি থানায় একটি— মোট সাতটি মামলা দায়ের হয়েছে। প্রতিটি মামলাতেই ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে রাজ্যের সদ্য প্রণীত গুন্ডাদমন আইন। এই আইন কার্যকর হওয়ার পর এটিই প্রথম বড় পদক্ষেপ বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।
শুভেন্দু জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখে মোট ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এঁদের অধিকাংশই ছাত্র নন, এমনকি আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তাদের সঙ্গেও তাঁদের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। নিট বা শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে এঁদের কোনও যোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বিধানসভাতেই পাঁচ জন অভিযুক্তের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, রাজাবাগানের আফরোজ, খিদিরপুরের নাহিদ, একবালপুরের তনবীর ও নিজাম এবং ওয়াটগঞ্জের রাহুল জামাল এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে শুভেন্দু বলেন, “এই পাঁচ জন কুখ্যাত গুন্ডার নাম আমি রেকর্ডে রাখলাম। গুন্ডাদমন আইনে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে শুধু ওরা নয়, ওদের তিন পুরুষও এই শাস্তির কথা মনে রাখবে। এই কারণেই আইনটি আনা হয়েছিল। আজ মানুষ বুঝতে পারছেন, কেন এই আইনের প্রয়োজন ছিল।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠনও মিছিলে যোগ দেয়। তবে তাঁদের অনেকেই আদৌ ছাত্র কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের কোনও অস্তিত্বই নেই। আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শুভেন্দু।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিবাদে শনিবার বিধানসভার মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদে সামিল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজেপি বিধায়কেরা। সেই কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠা প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষেও আন্দোলনকারীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর মন্তব্য, “ডিম ছোড়া যদি বাংলার সংস্কৃতি না হয়, তবে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে জলের বোতল বা জুতো ছোড়াও বাংলার সংস্কৃতি হতে পারে না। গণতন্ত্রের নামে এই ধরনের হিংসা কোনও সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।”
পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের তরফে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পাঁচটি মামলা দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলাও করেছে পুলিশ। বেআইনি জমায়েত, সরকারি কর্মীর কাজে বাধা, হিংসা, ভাঙচুর, হামলা এবং অশান্তিতে উসকানির মতো একাধিক ধারায় তদন্ত এগোচ্ছে। ইতিমধ্যেই চিহ্নিত অভিযুক্তদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ। ধর্মতলার অশান্তি ঘিরে রাজ্যের রাজনীতি যে আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।