ক্ষমতার অলিন্দে যাঁদের বিচরণ, তাঁদের সম্পদের অঙ্কও কি সমান চমকপ্রদ? দেশের ৩১ জন মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধানদের নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিল।
আর সেই রিপোর্টে উঠে এল একাধিক বিস্ময়কর তথ্য। একদিকে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার, যাঁর ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ ১,৪১৩.৭৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সম্পদের নিরিখে তালিকার একেবারে নিচের সারিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর ঘোষিত সম্পত্তি মাত্র ৮৫.৮৭ লক্ষ টাকা।
তবে সবচেয়ে কম সম্পত্তির মালিকের তকমা গিয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর ঝুলিতে। তাঁর ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ মাত্র ৫৫.২৪ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, দেশের সবচেয়ে ধনী মুখ্যমন্ত্রী ও সবচেয়ে কম সম্পত্তির মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ব্যবধান প্রায় ১,৪১৩ কোটি টাকা— যা ভারতীয় রাজনীতিতে সম্পদের বৈষম্যের এক স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেছে।
শুভেন্দুর নামে নেই কোনও স্থাবর সম্পত্তি
এডিআর-এর রিপোর্টে আরও একটি তথ্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নামে নিজস্ব কোনও স্থাবর সম্পত্তি নেই। জমি, বাড়ি বা অন্য কোনও অচল সম্পত্তির উল্লেখ তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় নেই। তাঁর বার্ষিক আয় ১৭.৩৮ লক্ষ টাকা বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদের নিরিখে তিনি দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে, শীর্ষে থাকা ডি কে শিবকুমারের সম্পদের বড় অংশই জমি, বাণিজ্যিক সম্পত্তি, আবাসন, সংস্থায় বিনিয়োগ, ব্যাঙ্ক আমানত, শেয়ার এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থেকে এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিনিয়োগও তাঁর বিপুল সম্পদের অন্যতম উৎস বলে হলফনামা থেকে জানা যায়।
শুধু সম্পত্তি নয়, মামলার তালিকাতেও চমক
এডিআর-এর রিপোর্টে শুধু সম্পত্তির হিসাবই নয়, মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার ছবিও তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ৩১ জন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৫ শতাংশ মুখ্যমন্ত্রী কোনও না কোনও মামলার মুখোমুখি। তাঁদের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
এই তালিকায় সবচেয়ে উপরে রয়েছেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেভন্ত রেড্ডি। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৮৯টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৭২টি গুরুতর অপরাধ সংক্রান্ত। রাজনৈতিক প্রতিবাদ, নির্বাচনী সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ-সহ বিভিন্ন মামলার উল্লেখ রয়েছে তাঁর হলফনামায়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও ২৯টি মামলা বিচারাধীন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এর অধিকাংশই রাজনৈতিক আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলা। যদিও মামলাগুলির বিচার এখনও শেষ হয়নি এবং আদালতে সেগুলি বিচারাধীন।
মুখ্যমন্ত্রীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক ছবিও স্পষ্ট
এডিআর-এর বিশ্লেষণে দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের একটি সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক চিত্রও উঠে এসেছে। ৩১ জন মুখ্যমন্ত্রীর মোট ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ৩,৬৬০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে গড়ে প্রত্যেক মুখ্যমন্ত্রীর সম্পত্তির পরিমাণ ১১৮.০৭ কোটি টাকা। লিঙ্গের নিরিখে তালিকাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ৩১ জনের মধ্যে একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী দিল্লির রেখা গুপ্তা। বয়সের নিরিখে সবচেয়ে প্রবীণ মুখ্যমন্ত্রী পুদুচেরির এন. রঙ্গাস্বামী, বয়স ৭৫ বছর।
অন্যদিকে, সবচেয়ে কম বয়সি মুখ্যমন্ত্রী অরুণাচল প্রদেশের পেমা খান্ডু এবং মেঘালয়ের কনরাড সাংমা। দু'জনেরই বয়স ৪৪ বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯ জন মুখ্যমন্ত্রী স্নাতকোত্তর, ৭ জন স্নাতক, ৬ জন পেশাদার গ্র্যাজুয়েট, ৩ জন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। আবার মাত্র ২ জন মুখ্যমন্ত্রী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।
স্বচ্ছতার আয়না
প্রতি নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে এডিআর যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তা শুধু জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাবই নয়, তাঁদের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয় এবং আইনি অবস্থানেরও একটি স্বচ্ছ ছবি তুলে ধরে। এবারের রিপোর্টও তার ব্যতিক্রম নয়।
একদিকে হাজার কোটির সম্পদের মালিক মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে লক্ষ টাকার সম্পত্তিধারী মুখ্যমন্ত্রী— এই দুই মেরুর ছবি যেমন সামনে এসেছে, তেমনই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যাও নতুন করে জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।