বাড়ি থেকে কাজ। অফিসের মতোই নির্দিষ্ট সময়। কম্পিউটার সামনে। কিন্তু কাজের ফাঁকে একটু উঠে দাঁড়ানো, নিজের মতো করে কয়েক মিনিট নেওয়া, কিংবা একান্তে কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ, ম্যানেজারের সঙ্গে প্রায় গোটা কর্মদিবসই ভিডিয়ো কলে থাকতে হচ্ছে এক কর্মীকে। আর সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘উনি আমার জীবনটা দুর্বিষহ করে তুলছেন।’’
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে একটি অনলাইন আলোচনার মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট কর্মীর দাবি, তিনি বাড়ি থেকে কাজ করেন এবং তাঁর ম্যানেজার প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে দীর্ঘ সময় ভিডিয়ো কলে রাখতে চান। কখনও ছয় ঘণ্টা, কখনও সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত কল চলতে থাকে। ভিডিয়ো কলে থাকার পাশাপাশি অনেক সময় তাঁকে স্ক্রিন শেয়ার করে কাজ করতে হয়। ফলে ম্যানেজার কার্যত তাঁর কাজের পুরো সময়টাই নজরে রাখতে পারছেন।
অভিযোগের আরও অস্বস্তিকর দিক হল, এই দীর্ঘ ভিডিয়ো কলের সবটাই যে কাজের প্রয়োজনেই হয়, তা নয়। কর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, ম্যানেজার কখনও নিজের নানা কথা বলেন, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। কখনও আবার নিজের কাজের বিষয়ে কর্মীর মতামত চান। ফলে যে সময়টা কর্মীর নিজের কাজ করার কথা, সেটাও অনেকটা ম্যানেজারের সঙ্গে অনলাইন উপস্থিতিতে কেটে যাচ্ছে।
কর্মী জানিয়েছেন, ম্যানেজার এবং তিনি একই বিভাগের কার্যত দু’জন কর্মী। ফলে সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে। সরাসরি আপত্তি জানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে—এই আশঙ্কাতেই তিনি সমস্যাটি কী ভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে পরামর্শ চেয়েছেন।
ঘটনাটি সামনে আসতেই কর্মক্ষেত্রে ‘মাইক্রোম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্মীকে দায়িত্ব দিয়ে কাজের ফলাফল দেখার বদলে তিনি কখন কী করছেন, কতক্ষণ কম্পিউটারের সামনে রয়েছেন, কখন বিরতি নিচ্ছেন—প্রতিটি মুহূর্তের উপর নজর রাখাকে মাইক্রোম্যানেজমেন্ট বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের নজরদারি কর্মীর স্বাধীনতা ও কাজের পরিবেশ দু’টিই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আসলে বাড়ি থেকে কাজের ক্ষেত্রে এই সমস্যা নতুন নয়। কর্মীর শরীর বা মুখ ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে কি না, কম্পিউটারে তাঁর কার্যকলাপ কতক্ষণ চলছে—এ ধরনের নজরদারি নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন কর্মী অনলাইন ফোরামে জানিয়েছেন, তাঁদের কাজের প্রতিটি মিনিট সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে হিসাব করা হয় এবং বিরতি নিলেও তার প্রভাব পড়ে কাজের মূল্যায়নে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—কাজের জন্য কি কর্মীকে নিয়োগ করা হয়, নাকি কর্মীকে সারাক্ষণ নজরে রাখার জন্য?
অবশ্য কোনও কোনও পেশায় দীর্ঘ ভিডিয়ো উপস্থিতির যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, প্রশিক্ষণ, ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনা বা দলগত কাজের ক্ষেত্রে ক্যামেরা অন রাখা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা একজন কর্মীকে ম্যানেজারের সঙ্গে ভিডিয়ো কলে আটকে রাখা সেই প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন।
আরও একটি সমস্যা হল, ক্যামেরায় কর্মীর মুখ দেখা যাচ্ছে মানেই তিনি বেশি কাজ করছেন—এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বরং কর্মী যদি মনে করেন, প্রতিটি মুহূর্তে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা হলে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। কাজের মানের বদলে ‘অনলাইনে কতক্ষণ ছিলেন’ যদি কর্মদক্ষতার মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তা হলে কর্মক্ষেত্রে আস্থার জায়গাটিই দুর্বল হয়।
এর আগে ভিডিয়ো মিটিংয়ে ক্যামেরা বন্ধ রাখা নিয়েও কর্মী-ম্যানেজারের সংঘাতের ঘটনা ভাইরাল হয়েছে। এক ঘটনায় অসুস্থতার কারণে ক্যামেরা বন্ধ রাখা এক কর্মীকে ম্যানেজার নিয়ম ভাঙার জন্য বকেছিলেন; পরে ক্যামেরা চালু করতেই হাসপাতালের ঘর দেখা যায়। ঘটনাটি সমাজমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।
ফলে এই নতুন অভিযোগ শুধু এক কর্মীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। বাড়ি থেকে কাজের যুগে ‘নজরদারি’ আর ‘আস্থা’-র সীমারেখা কোথায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে ঘটনাটি। শেষ পর্যন্ত কর্মীর অভিযোগের সারকথা একটাই—কাজের সময়টা যেন কাজের জন্য থাকে, সারাক্ষণ বসের চোখের সামনে থাকার জন্য নয়। আর সেই জায়গা থেকেই তাঁর আক্ষেপ, ‘‘উনি আমার জীবনটা দুর্বিষহ করে তুলছেন।’’
বসের নজরদারি কি কাজের মান বাড়ায়, নাকি কর্মক্ষেত্রকে আরও অসহ্য করে তোলে? ভাইরাল ভিডিয়ো সেই পুরনো প্রশ্নটাই ফের সামনে এনে দিল।