বিশেষ প্রতিবেদন: ১২ হাজার বছরেরও বেশি আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে ডায়ার উলফ। বরফযুগের দৈত্যাকার লোমশ হাতি ম্যামথও আজ শুধুই জীবাশ্ম আর ইতিহাসের পাতায়। এ বার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রাচীন ডিএনএ এবং জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সেই বিলুপ্ত প্রাণীদের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে সত্যিই কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হারিয়ে যাওয়া কোনও প্রজাতিকে? নাকি তৈরি হবে আধুনিক প্রাণীর শরীরে প্রাচীন জীবের কিছু বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ? সেই প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বৈজ্ঞানিক বিতর্ক।
হলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘জুরাসিক পার্ক’-এ বিজ্ঞানীরা জিন প্রযুক্তির সাহায্যে বিলুপ্ত ডাইনোসর ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাস্তবে সেই কল্পনার সঙ্গে বিজ্ঞানের দূরত্ব এখনও বিস্তর। লক্ষ লক্ষ বছর আগের ডাইনোসরকে ফিরিয়ে আনার মতো অক্ষত ডিএনএ পাওয়া কার্যত অসম্ভব। কিন্তু তুলনায় সাম্প্রতিক অতীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে আধুনিক জিন প্রযুক্তি। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই কোমর বেঁধেছে আমেরিকার টেক্সাসের জৈবপ্রযুক্তি সংস্থা কলোসাল বায়োসায়েন্সেস।
সংস্থাটির লক্ষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং ক্রিসপার জিন সম্পাদনার প্রযুক্তির সাহায্যে বিলুপ্ত প্রাণীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা। তাদের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ডায়ার উলফ এবং লোমশ ম্যামথ। ডায়ার উলফ ছিল বরফযুগের এক ধরনের বড় নেকড়ে, যা প্রায় ১২,৫০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অন্য দিকে, লোমশ ম্যামথ ছিল হাতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, যার শরীর ঘন লোমে ঢাকা থাকত এবং যা প্রচণ্ড ঠান্ডার পরিবেশে বেঁচে থাকার উপযোগী ছিল।
এআই কী ভাবে ফিরিয়ে আনছে বিলুপ্ত প্রাণীর জিনগত নকশা?
বিলুপ্ত প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল তাদের ডিএনএ। হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নীচে বা জীবাশ্মের মধ্যে সংরক্ষিত ডিএনএ সময়ের সঙ্গে ভেঙে যায়। ফলে প্রাচীন প্রাণীর সম্পূর্ণ জিনগত নকশা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। এখানেই কাজে লাগানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ডায়ার উলফের ক্ষেত্রে গবেষকেরা হাজার হাজার বছর পুরনো জীবাশ্মের দাঁত ও মাথার খুলির নমুনা থেকে পাওয়া জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করেছেন।
সেই উপাদানের ভাঙা অংশগুলিকে কম্পিউটারের সাহায্যে সাজিয়ে প্রাচীন প্রাণীটির জিনগত নকশা পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে। তার পর সেই নকশার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বর্তমানে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা ধূসর নেকড়ের জিনের। ধূসর নেকড়ে ডায়ার উলফের জীবিত প্রজাতি নয়, তবে জিনগত তুলনা এবং গবেষণার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা দুই প্রাণীর জিনের পার্থক্য খতিয়ে দেখে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন, যা ডায়ার উলফকে অন্য নেকড়ের থেকে আলাদা করত। সেই সূত্র ধরেই আধুনিক ধূসর নেকড়ের কোষে নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভ্রূণকে গর্ভে ধারণ করানোর জন্য গৃহপালিত কুকুরকে বিকল্প মাতৃপ্রাণী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। সংস্থার দাবি, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর উত্তর টেক্সাসে জন্ম হয়েছিল রোমুলাস ও রেমাস নামে দুটি পুরুষ শাবকের। পরে খালিসি নামে একটি স্ত্রী শাবকেরও জন্ম হয়। তবে এই সাফল্যকে ঠিক কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, এই শাবকগুলি প্রকৃত ডায়ার উলফ নয়; বরং জিনগত ভাবে পরিবর্তিত ধূসর নেকড়ে, যাদের শরীরে বিলুপ্ত প্রাণীটির কিছু বৈশিষ্ট্য আনার চেষ্টা হয়েছে। অর্থাৎ, বিলুপ্ত প্রজাতির হুবহু পুনর্জন্ম ঘটেছে—এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিক ভাবে বিতর্কিত।
এ বার লক্ষ্য বরফযুগের দৈত্যাকার ম্যামথ
ডায়ার উলফের পর কলোসালের নজর লোমশ ম্যামথের দিকে। কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া এই প্রাণী এক সময় উত্তর গোলার্ধের ঠান্ডা অঞ্চলে বিচরণ করত। তার শরীরে ছিল ঘন লোম, ঠান্ডা সহ্য করার উপযোগী শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং তাপ ধরে রাখার উপযোগী বিপাকক্রিয়া। আধুনিক এশীয় হাতি ম্যামথের ঘনিষ্ঠ জীবিত আত্মীয় হওয়ায় তাকে গবেষণার ভিত্তি হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা, প্রাচীন ম্যামথের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত জিন চিহ্নিত করা। তার পরে এশীয় হাতির কোষে প্রয়োজনীয় জিনগত পরিবর্তন এনে ম্যামথের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণী তৈরির চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঘন লোম, ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা এবং শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য।
তবে এ কাজ ডায়ার উলফের ক্ষেত্রেও যতটা সহজ মনে হয়, ম্যামথের ক্ষেত্রে তার চেয়েও কঠিন।
কারণ, একটি প্রাণীর চেহারা, শরীরের গঠন, বিপাকক্রিয়া এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অসংখ্য জিনের পারস্পরিক ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। শুধু কয়েকটি জিন বদলে দিলেই একটি এশীয় হাতি পুরোপুরি লোমশ ম্যামথ হয়ে যাবে, এমন নয়। ম্যামথের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় ৬০টি জিনে পরিবর্তনের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই সংখ্যা ১৫০-রও বেশি হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে প্রকল্পের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংস্থাটি এখন ২০৩০-এর দশকে ম্যামথের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রথম প্রাণীর জন্ম দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
শুধু কৌতূহল নয়, পরিবেশ রক্ষার যুক্তিও
বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টার পিছনে শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল বা বিরল প্রাণী তৈরির আকাঙ্ক্ষা নেই বলে দাবি করছে সংস্থাটি। তাদের বক্তব্য, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
ম্যামথ প্রকল্পের অন্যতম যুক্তি হল, উত্তর মেরু সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে এই প্রাণীদের ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। বরফযুগে ম্যামথের মতো বড় তৃণভোজী প্রাণীরা গাছপালা খেত, ঝোপঝাড় মাড়িয়ে চলত এবং বরফে ঢাকা ভূখণ্ডের পরিবেশকে প্রভাবিত করত। কলোসালের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ম্যামথের মতো প্রাণী ওই অঞ্চলে বিচরণ করলে তুষারের স্তর চেপে দিতে পারে। তাতে ঠান্ডা বাতাস মাটির গভীরে পৌঁছনোর সুযোগ বাড়বে এবং পারমাফ্রস্ট—অর্থাৎ দীর্ঘকাল জমাট অবস্থায় থাকা মাটি—ঠান্ডা রাখতে সাহায্য মিলতে পারে।
এ ছাড়া গাছপালা খাওয়া ও ঝোপঝাড় মাড়ানোর ফলে কিছু এলাকায় ঘাসে ঢাকা উন্মুক্ত ভূদৃশ্য তৈরি হতে পারে। সংস্থার মতে, এই ধরনের পরিবর্তন সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা বাড়িয়ে স্থানীয় পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় এ ধরনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে।
তবে এই যুক্তি এখনও পরীক্ষাধীন। আধুনিক সময়ে তৈরি ম্যামথ-সদৃশ প্রাণী প্রাচীন ম্যামথের মতোই বাস্তুতন্ত্রে কাজ করবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বরফযুগের পরিবেশ এবং বর্তমান আর্কটিক অঞ্চলের পরিস্থিতিও এক নয়। তাই বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনলেই জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার সমাধান হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
বিজ্ঞানের সাফল্য, না কি নতুন নৈতিক প্রশ্ন?
বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নৈতিক ও পরিবেশগত প্রশ্ন। জিনগত ভাবে পরিবর্তিত প্রাণীদের জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশ, গর্ভধারণ, জন্মের পর পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নিয়ে নানা ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে হাতির মতো বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সময় দীর্ঘ। কোনও পরীক্ষায় ব্যর্থতা ঘটলে তার প্রভাব শুধু গবেষণার উপর নয়, জীবন্ত প্রাণীর কল্যাণের উপরও পড়তে পারে।
এ ছাড়া, কোনও বিলুপ্ত প্রাণীর মতো দেখতে প্রাণী তৈরি করলেই কি সেই প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনা বলা যায়? একটি প্রাণীর পরিচয় কি শুধু তার জিনের উপর নির্ভর করে, নাকি তার আচরণ, শেখার ক্ষমতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে তার যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর নেই।
বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণেও সাহায্য করতে পারে। অন্যদের আশঙ্কা, বিপুল অর্থ ও গবেষণার পরিকাঠামো বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে ব্যয় করার বদলে বর্তমানে বিপন্ন প্রাণী এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ডাইনোসর নয়, তবু বদলে যেতে পারে বিজ্ঞানের দুনিয়া
কলোসালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বেন ল্যাম জানিয়েছেন, আগামী এক-দু’বছরে বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। তবে ডাইনোসর ফিরিয়ে আনার সঙ্গে এই গবেষণার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোটি কোটি বছর আগের ডাইনোসরের কার্যকর ডিএনএ হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাই ‘জুরাসিক পার্ক’-এর মতো ডাইনোসরদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ধারণা এখনও কল্পবিজ্ঞানের জগতেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু ডায়ার উলফ ও ম্যামথের মতো তুলনায় সাম্প্রতিক অতীতে বিলুপ্ত প্রাণীদের ক্ষেত্রে প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ, এআই এবং জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই গবেষণা সফল হলে প্রাণীর জিনগত নকশা বোঝা, বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণ এবং জীববিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—মানুষ কি সত্যিই বিলুপ্তিকে উল্টে দিতে পারবে? নাকি সে তৈরি করবে অতীতের কিছু বৈশিষ্ট্য বহনকারী নতুন প্রাণী? উত্তর মিলবে আরও গবেষণা, পরীক্ষা এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পরেই। আপাতত বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগৎ থেকে বাস্তবের গবেষণাগারে পা রেখেছে এক দুঃসাহসী চেষ্টা। তার সাফল্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই জরুরি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা, ঝুঁকি এবং নৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণ করা।
