বেজিং: মাথার ভিতরে বসানো থাকবে ছোট্ট একটি যন্ত্র। হাত-পা নাড়ানোর প্রয়োজন নেই, মুখে নির্দেশ দেওয়ারও দরকার নেই। মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত পড়েই কম্পিউটার বুঝে নেবে মানুষ কী করতে চাইছেন। সেই সংকেতের ভিত্তিতে নড়বে রোবোটিক হাত, নিয়ন্ত্রণ করা যাবে ডিজিটাল যন্ত্র। এত দিন যা ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো, সেই প্রযুক্তিকেই বাস্তবের আরও কাছে নিয়ে এসেছে চিন।
নাম ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI)। মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংকেতকে সরাসরি কম্পিউটার বা অন্য কোনও যন্ত্রের নির্দেশে পরিণত করাই এর মূল কাজ। বিশেষ করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা গুরুতর স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ, যাঁরা নিজের হাত-পা নাড়াতে বা কথা বলতে পারেন না, তাঁদের জন্য এই প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রযুক্তি নিয়ে চিন এখন আর শুধু গবেষণাগারে আটকে নেই। ২০২৬ সালে চিনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি আক্রমণাত্মক BCI চিকিৎসা-যন্ত্র বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। সাংহাইয়ের Neuracle তৈরি NEO নামে কয়েনের মতো ছোট একটি চিপ মস্তিষ্কের বাইরের আবরণে বসানো হয়। সেটি মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংকেত সংগ্রহ করে কম্পিউটারে পাঠায়। সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর হাত নাড়ানোর মতো কাজ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থাৎ, মস্তিষ্কে কোনও নির্দেশ তৈরি হলেই তা তারের মাধ্যমে সরাসরি পৌঁছে যেতে পারে কম্পিউটারে। কম্পিউটার সেই সংকেতকে অনুবাদ করে যন্ত্রকে নির্দেশ দেবে। যেমন, কোনও রোগী মনে মনে হাত মুঠো করার চেষ্টা করলেন। তাঁর শরীর হয়তো সাড়া দিল না। কিন্তু মস্তিষ্কের সেই সংকেত শনাক্ত করে BCI সেটিকে বৈদ্যুতিন নির্দেশে বদলে দিতে পারে। তার পর রোবোটিক গ্লাভস নড়ে উঠতে পারে।
চিনের গবেষণায় ইতিমধ্যে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের কম্পিউটার কার্সর নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল যন্ত্র চালানো এবং রোবোটিক হাত ব্যবহারের মতো কাজের পরীক্ষা হয়েছে। চিনা গবেষকেরা BCI-কে শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না। ভবিষ্যতে পরিধানযোগ্য যন্ত্রের মাধ্যমে চালকের ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি শনাক্ত করা, কর্মক্ষেত্রে বিপদের আগাম সংকেত দেওয়া এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
আর এখানেই শুরু হচ্ছে নতুন প্রতিযোগিতা। ইলন মাস্কের Neuralink-সহ আমেরিকার একাধিক সংস্থা মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটারের সরাসরি যোগাযোগ তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। চিনও এই দৌড়ে দ্রুত এগোতে চাইছে। ২০২৫ সালে চিন সরকার BCI-কে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভাবে প্রতিযোগিতামূলক BCI শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য জানিয়েছিল।
শুধু গবেষণাই নয়, শিল্পক্ষেত্রেও সেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। চিনে ইতিমধ্যেই BCI-কে কেন্দ্র করে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রযুক্তির জন্য পৃথক জাতীয় মানও কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ শুধু চিপ বানানো নয়, BCI-এর কাঠামো এবং তথ্য আদানপ্রদানের পদ্ধতিকে মানসম্মত করার কাজও এগোচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তিগত নয়—নৈতিক। মানুষের মস্তিষ্ক থেকে পাওয়া সংকেত সাধারণ ব্যক্তিগত তথ্যের মতো নয়। কোনও যন্ত্র যদি মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পড়তে পারে, সেই তথ্য কার হাতে থাকবে? তা কতটা নিরাপদ থাকবে? কোনও সংস্থা কি সেই তথ্য বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার করতে পারবে? ভবিষ্যতে একজন মানুষের ইচ্ছা, মনোযোগ বা মানসিক অবস্থার কিছু অংশ যদি যন্ত্র বিশ্লেষণ করতে পারে, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা কোথায় থাকবে—এমন প্রশ্নও ইতিমধ্যে উঠছে।
আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা। মস্তিষ্কের সংকেত অত্যন্ত জটিল। একই সংকেতকে সব মানুষের ক্ষেত্রে একই ভাবে পড়া যায় না। দীর্ঘ সময় চিপ ব্যবহার করলে তার নিরাপত্তা কতটা, সংকেত কত দিন স্থিতিশীল থাকবে এবং যন্ত্রের ভুল নির্দেশে কী ধরনের বিপদ হতে পারে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। চিনা বিশেষজ্ঞরাও প্রযুক্তির নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং নৈতিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তবু পরিবর্তনের গতি স্পষ্ট। এক সময় মস্তিষ্কের সংকেত পড়ে যন্ত্র চালানো ছিল গবেষণাগারের পরীক্ষা। এখন তা পৌঁছে গিয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায়। চিনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া আক্রমণাত্মক BCI সেই পরিবর্তনেরই বড় উদাহরণ।
আজ যে প্রযুক্তি পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষকে হাত নাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে, কাল সেটিই হয়তো কম্পিউটার, রোবোটিক যন্ত্র কিংবা অন্য ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে দেবে। কিন্তু মস্তিষ্কের দরজা যখন প্রযুক্তির সামনে খুলছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ‘কী করা সম্ভব?’ নয়—‘কতটা করা উচিত?’
চিনের দৌড় তাই কেবল নতুন একটি চিকিৎসা-প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা নয়। মানুষের মস্তিষ্ক এবং যন্ত্রের মাঝের দূরত্ব যখন ক্রমশ কমছে, তখন শুরু হচ্ছে এক নতুন যুগেরও পরীক্ষা।
