বেজিং: গাড়ির ছাদে লাফ, শূন্যে ডিগবাজি, তার পর সজোরে লাথি—আঘাতে দুমড়ে গেল গাড়ির দরজা! পরক্ষণেই চার মিটার উঁচু মঞ্চ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাটিতে নেমে ভারসাম্য সামলে নিল যন্ত্রমানব। শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়, এ বার তার ভূমিকা রক্ষকেরও। ছুরি হাতে এক ব্যক্তি এক মহিলার দিকে এগিয়ে যেতেই সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। অন্য দৃশ্যে গাড়ির নীচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে গাড়ির সামনের অংশ তুলে ধরল। আবার ছুটে আসা গাড়ির সামনে থেকে এক পথচারীকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। হলিউডের অ্যাকশন ছবির মতো এই সব দৃশ্য আসলে চিনের রোবট নির্মাতা সংস্থা ইউনিট্রির নতুন হিউম্যানয়েড রোবট ‘এইচ২-এক্স কুং ফু লেজেন্ড: গার্ডিয়ান’-এর প্রচারমূলক ভিডিয়োর অংশ। প্রশ্ন উঠছে, মানুষের মতো দেখতে এই যন্ত্রমানব কি ভবিষ্যতে সত্যিই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হয়ে উঠতে পারবে?
কুং ফু-র কায়দায় যন্ত্রমানবের শক্তি প্রদর্শন
চিনের হ্যাংঝৌভিত্তিক সংস্থা ইউনিট্রি রোবোটিক্স ২১ অক্টোবর প্রকাশ করে প্রায় এক মিনিটের এই ভিডিয়ো। তাতে রোবটটির ক্ষিপ্রতা, শারীরিক ভারসাম্য এবং আঘাত সামলানোর ক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। একটি গাড়ির ছাদে উঠে ডিগবাজি খাওয়া, লাফিয়ে নেমে দরজায় লাথি ও ঘুষি চালানো, হাঁটু ও কনুইয়ের আঘাতে গাড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা—একাধিক দৃশ্যে রোবটটির শক্তি ও গতির প্রদর্শন দেখা গিয়েছে। ভিডিয়োয় চার মিটার উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্যও রয়েছে। মাটিতে নেমে শরীরের ভারসাম্য ধরে রেখে ফের কসরত শুরু করে রোবটটি।
মানুষের মতো শরীরের ভঙ্গি বজায় রেখে দ্রুত দিক পরিবর্তন করা এবং লাফের পর স্থিতি ফিরে পাওয়ার ক্ষমতাই এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। তবে এই সব দৃশ্য দেখে রোবটটির বাস্তব কর্মক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। ভিডিয়োয় দেখানো কসরত কতটা ধারাবাহিক ভাবে করা সম্ভব, বিভিন্ন পরিবেশে তার কার্যকারিতা কেমন, কিংবা বাস্তব পরিস্থিতিতে সে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি সংস্থা।
ছুরি হাতে হামলাকারী, মহিলার সামনে রক্ষক
ভিডিয়োর দ্বিতীয় অংশে রোবটটির সম্ভাব্য নিরাপত্তারক্ষীর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। এক দৃশ্যে, মুখ ঢাকা এক ব্যক্তি ছুরি হাতে মহিলার দিকে এগিয়ে যায়। তখন এইচ২-এক্স মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং হামলাকারীকে প্রতিহত করার ভঙ্গি করে। অন্য একটি দৃশ্যে গাড়ির নীচে আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য গাড়ির সামনের অংশ তুলে ধরতে দেখা যায় তাকে। আর একটি দৃশ্যে দ্রুত এগিয়ে আসা গাড়ির পথ থেকে এক পথচারীকে সরিয়ে দেওয়ার কসরত দেখানো হয়েছে। রোবটটি নিজেও গাড়ির ধাক্কা সামলানোর মতো পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে।
এই দৃশ্যগুলির মাধ্যমে ইউনিট্রি বোঝাতে চেয়েছে, হিউম্যানয়েড রোবটকে শুধু কারখানার কাজে বা বিনোদনের জন্য নয়, বিপদের মুহূর্তে মানুষের সহায়তার কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ, বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের পরিবর্তে কাজ করা কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের মতো ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে।
কিন্তু ভিডিয়োর দৃশ্যগুলি পরিকল্পিত প্রদর্শনী। বাস্তবে কোনও হামলাকারীকে নিরস্ত করা বা গাড়ির নীচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে রোবটটি কতটা নির্ভরযোগ্য, তার স্বাধীন পরীক্ষার ফল এখনও সামনে আসেনি।
আট ঘণ্টা চলবে, কিন্তু কী ভাবে?
ইউনিট্রির দাবি, এইচ২-এক্সের সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতার মেয়াদ প্রায় আট ঘণ্টা। তবে এই দাবি থেকে এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না যে রোবটটি টানা আট ঘণ্টা ধরে লাফানো, লড়াই করা বা ভারী বস্তু তোলার মতো কাজ করতে পারবে। সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়সীমা মূলত দাঁড়িয়ে থাকার স্থায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটানা জটিল শারীরিক কাজ করলে ব্যাটারির ক্ষমতা কতটা কমবে, তা স্পষ্ট নয়। রোবটটির দাম, বাজারে আসার নির্দিষ্ট দিন এবং সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যও এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সাধারণ ক্রেতা কিংবা নিরাপত্তা সংস্থাগুলি কবে এটি কিনতে পারবে, আদৌ বাণিজ্যিক ভাবে বাজারে আসবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউনিট্রির আগের এইচ২ মডেলটি প্রায় ১.৮২ মিটার লম্বা এবং ওজন প্রায় ৭০ কিলোগ্রাম। তবে এইচ২-এক্সের সব বৈশিষ্ট্য আগের মডেলের মতোই কি না, সে বিষয়ে সংস্থা বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
আসল পরীক্ষা শক্তি নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা
রোবটের লাফ, ঘুষি বা ডিগবাজি দেখে বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করতে গেলে শুধু শারীরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োজন। ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে আসছেন। তিনি কি সত্যিই হামলা করতে চলেছেন, নাকি সাহায্য চাইতে আসছেন? তাঁর হাতে থাকা কোনও বস্তু কি অস্ত্র, নাকি সাধারণ জিনিস? পরিস্থিতি না বুঝে রোবট যদি কাউকে আক্রমণকারী বলে ধরে নেয়, তা হলে নিরীহ মানুষও বিপদে পড়তে পারেন। আবার কাউকে থামাতে গিয়ে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করলে গুরুতর আঘাত লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
এইচ২-এক্সের ক্ষেত্রে এই ধরনের পরিস্থিতি কী ভাবে সামলানো হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। ভিডিয়োয় দেখানো ঘটনাগুলি কি রোবট নিজে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঘটিয়েছে, নাকি আগে থেকে নির্ধারিত নির্দেশ, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ অথবা নির্দিষ্ট কোরিওগ্রাফি মেনে কাজ করেছে—তা জানায়নি ইউনিট্রি। ফলে একে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তারক্ষী বলে ধরে নেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই।
বিপদের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাবে, না তৈরি করবে নতুন বিপদ?
হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার নিয়ে চিনে এখন যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রের কাজ, বিপজ্জনক পরিবেশে উদ্ধার অভিযান এবং মানুষের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। যন্ত্রকে দিয়ে বিপজ্জনক কাজ করানো গেলে মানুষের প্রাণের ঝুঁকিও কমতে পারে। কিন্তু যে রোবট গাড়ির দরজা দুমড়ে দিতে পারে, তার ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতিও গুরুতর হতে পারে। নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করার সময় সে কাকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করবে, কতটা শক্তি প্রয়োগ করবে এবং ভুল হলে দায় কার উপর বর্তাবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। প্রযুক্তির ক্ষমতা যত বাড়বে, তার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ব্যবহারের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
ইউনিট্রি নিজেও রোবটটিকে নিরাপদে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। বিপজ্জনক কসরত অনুকরণ না করা, রোবটের নিজস্ব কাঠামোয় অননুমোদিত পরিবর্তন না আনা এবং তার কাছাকাছি থাকার সময় সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে সংস্থা।
চিনের এই ‘কুং ফু রোবট’ তাই এক দিকে যন্ত্রমানবের দ্রুত উন্নতিশীল প্রযুক্তির ঝলক, অন্য দিকে ভবিষ্যতের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সামনে থাকা কঠিন প্রশ্নগুলিরও ইঙ্গিত। লাথিতে গাড়ির দরজা দুমড়ে দেওয়া কিংবা ছুরি হাতে হামলাকারীর সামনে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে নজরকাড়া কীর্তি। কিন্তু বাস্তব বিপদে মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব নিতে হলে শুধু শক্তি নয়, চাই নির্ভুল বিচারবুদ্ধি, নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। সেই পরীক্ষায় এইচ২-এক্স কতটা সফল হবে, তার উত্তর এখনও ভবিষ্যতের হাতে।




