বিশেষ প্রতিবেদন: ক্যানসারের খবর শুনে জীবন থমকে গিয়েছিল তাঁর। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ৬৭ বছরের চিনা মহিলা ওয়াং ইং ঠিক করলেন, চিকিৎসার আগে পূরণ করবেন বহু দিনের এক স্বপ্ন। জীবনের সঞ্চয় খরচ করে পাড়ি দিলেন বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকায়। লক্ষ্য, নিজের ক্যামেরায় বন্দি করবেন পেঙ্গুইনের জীবন। এক মাসের সেই অভিযানে কখনও তুষারপাত, কখনও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কখনও প্রবল হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু স্বপ্নপূরণের আনন্দের পাশাপাশি দেশে ফিরে পেলেন আরও একটি অপ্রত্যাশিত খবর, পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আগের তুলনায় ছোট হয়েছে তাঁর টিউমার। আপাতত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন নেই বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে তাঁকে।
চিনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের বাসিন্দা ওয়াং পেশায় একটি স্কুলের প্রশাসনিক কর্মী ছিলেন। অবসরের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ২০১৩ সালে তাঁর থাইরয়েড ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু রোগের খবর পাওয়ার পর থেকেই জীবনকে অন্য ভাবে দেখতে শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ দিন ধরে পাখির ছবি তোলার নেশা ছিল তাঁর। পৃথিবীর নানা প্রান্তের পাখিদের ক্যামেরায় ধরেছেন। অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে পেঙ্গুইনের ছবি তোলার স্বপ্নও বহু দিনের। তাই অসুস্থতার খবর পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন আর পিছিয়ে রাখতে চাননি তিনি।
ওয়াংয়ের ভাবনা ছিল, জীবন যদি সত্যিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তা হলে এত দিনের ইচ্ছেটা অপূর্ণ রেখে লাভ কী? সেই সিদ্ধান্ত থেকেই অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের পরিকল্পনা। এক মাসের এই সফরে খরচ হয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ চিনা ইউয়ান, ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ১৮-২২ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। তাঁর সঞ্চয়ের তুলনায় এই খরচ বেশি হওয়ায় বাকি অর্থ জোগাতে সাহায্য করেন তাঁর মা। স্বপ্নপূরণের জন্য পরিবারের এই সহযোগিতাও ওয়াংয়ের যাত্রাকে সম্ভব করে তোলে।
লক্ষ্য ছিল মা পেঙ্গুইনের সঙ্গে ছানার মুহূর্ত
অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে ওয়াংয়ের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি বিশেষ ছবি তোলা—খাবার নিয়ে ফিরে এসে মা পেঙ্গুইন তার ছানাকে খাওয়াচ্ছে, এমন একটি মুহূর্ত। বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার ক্ষেত্রে ধৈর্যই সবচেয়ে বড় ভরসা। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য পাওয়া যায় না। ওয়াংও জানতেন, প্রকৃতির সামনে মানুষের পরিকল্পনা সব সময় সফল হয় না। তবু হাল ছাড়েননি তিনি।
প্রবল ঠান্ডা, তুষারপাত এবং ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে অন্য পর্যটকেরা যখন আশ্রয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখনও বাইরে অপেক্ষা করছিলেন ওয়াং। তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের প্রায় ১০ ডিগ্রি নীচে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে দেখা মেলে সেই দৃশ্যের। খাবার সংগ্রহ করে ফিরে আসে একটি মা পেঙ্গুইন, তার পর নিজের ছানাকে খাওয়াতে শুরু করে। সেই বিরল মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে ফেলেন ওয়াং।
ছবি তোলার আনন্দের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মা পেঙ্গুইন ও তার ছানাকে একসঙ্গে চলতে এবং নিজেদের আশ্রয়ের খোঁজ করতে দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কাছে সেটি শুধুই একটি ভাল ছবি নয়, বরং প্রকৃতির এক নিবিড় মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার অভিজ্ঞতা।
ফিরে এসে হাসপাতালে, পরীক্ষায় মিলল অপ্রত্যাশিত খবর
অ্যান্টার্কটিকা থেকে ফিরে হাসপাতালে গিয়ে আবার পরীক্ষা করান ওয়াং। তখনই দেখা যায়, আগের পরীক্ষার তুলনায় তাঁর টিউমারের আকার কমেছে। আগের পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় এক মাস আগে। এই পরিবর্তনে স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তি পান তিনি। চিকিৎসকেরা আপাতত অস্ত্রোপচার না করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
ক্যানসারের মতো রোগের ক্ষেত্রে এমন খবর রোগী ও তাঁর পরিবারের কাছে নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াংয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যে মানুষটি এক সময় রোগের খবর পেয়ে জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন, তিনি ফিরে পেলেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের কারণেই তাঁর টিউমার ছোট হয়েছে, এমন কোনও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। টিউমারের আকারের পরিবর্তনের পিছনে রোগের ধরন, তার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি, পরীক্ষার ব্যবধান এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত কারণ থাকতে পারে। তাই এই ঘটনাকে ভ্রমণ বা ইতিবাচক মানসিক অবস্থার মাধ্যমে ক্যানসার সেরে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
১২০০ প্রজাতির পাখির ছবি, ঘুরেছেন ৩০টিরও বেশি দেশ
অ্যান্টার্কটিকা অভিযান ওয়াংয়ের জীবনের শেষ বড় সফর হয়ে থাকেনি। বরং এই অভিজ্ঞতার পর বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বেড়েছে। এত দিন ধরে যে শখকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছিলেন, এখন সেটিকেই আরও বেশি সময় দিচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ১২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখির ছবি তুলেছেন ওয়াং। ঘুরেছেন বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ।
নিজের পেনশনের বড় অংশও উন্নত মানের ক্যামেরা ও ছবি তোলার সরঞ্জাম কেনার পিছনে খরচ করেছেন তিনি। তাঁর কাছে ক্যামেরা এখন শুধু শখ পূরণের মাধ্যম নয়, পৃথিবীকে নতুন ভাবে দেখার জানালা। বয়স বাড়লেও সেই আগ্রহে ভাটা পড়েনি। বরং জীবনের অনিশ্চয়তা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তাঁকে আরও বেশি করে পথে নামতে উৎসাহিত করেছে। তাঁর আগামী দিনের পরিকল্পনায় রয়েছে আমেরিকা, পেরু এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশে যাওয়ার ইচ্ছেও।
ওয়াংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে চিনের সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁর স্বপ্নপূরণের সাহস এবং জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন দেশ ঘুরে, নানা সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আগে যে সব বিষয় তাঁকে ভাবিয়ে তুলত, এখন সেগুলিকে অনেক সহজ ভাবে নিতে পারেন।
রোগের সঙ্গে লড়াইয়ে আশার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাও
ওয়াংয়ের কাহিনি নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণামূলক। কঠিন রোগের খবর পাওয়ার পরেও নিজের বহু দিনের স্বপ্ন পূরণ করার সিদ্ধান্ত তাঁকে জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। থাইরয়েড ক্যানসারের ধরন ও ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার বা অন্য চিকিৎসার পরামর্শ দেন, আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সতর্ক পর্যবেক্ষণের পথও বেছে নেওয়া হয়। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, তা নির্ভর করে পরীক্ষার ফল, টিউমারের বৈশিষ্ট্য এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর।
তাই ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একই ভাবে, কোনও ব্যক্তির টিউমার ছোট হয়েছে বলে সবার ক্ষেত্রেও তেমন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ওয়াংয়ের ঘটনায় চিকিৎসকেরা আপাতত পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন—এটি তাঁর নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
তবু এই কাহিনির আর একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। রোগের খবর অনেক সময় মানুষকে নিজের জীবন, ইচ্ছা এবং অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ওয়াংয়ের ক্ষেত্রে সেই ধাক্কা তাঁকে দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণের পথে ঠেলে দিয়েছে। বরফের দেশে পেঙ্গুইনের ছবি তোলার অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একটি স্মরণীয় সফর দেয়নি, জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহী হওয়ার উপলক্ষও তৈরি করেছে।
অ্যান্টার্কটিকা থেকে ফিরে টিউমার ছোট হওয়ার খবর তাঁর কাছে নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এই যে, অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের ভাল লাগা, স্বপ্ন এবং জীবনের আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া যায়। চিকিৎসার প্রয়োজনকে অস্বীকার না করেও জীবনের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব। ওয়াং ইং সেই পথেই এগোতে চান—কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে পাখিদের খুঁজতে খুঁজতে।
