নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও দিল্লিতে মেট্রো ও রেল পরিষেবা নিয়ে বিধিনিষেধ জারি রাখার অভিযোগ উঠল। সেই অভিযোগে এ বার শীর্ষ আদালতে দায়ের হল আদালত অবমাননার আবেদন। যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের আগে রাজধানীর গণপরিবহণে কড়াকড়ি নিয়ে শুক্রবারই প্রশ্ন তুলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তার কারণে পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু মেট্রো বা রেল চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যায় না। তার পরেও দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি) ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী।
তাঁর দাবি, এই পদক্ষেপ শীর্ষ আদালতের নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবেদনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার এবং ডিএমআরসি-র চেয়ারপার্সন ডি তারা-র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পদক্ষেপ করার আর্জি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহণের উপর ব্যাপক বিধিনিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক পরিষেবা ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলেছেন আবেদনকারী।
আদালতের নির্দেশের পরেও কেন বন্ধ গেট?
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের আগে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন ওঠে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মহনা। আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য গোটা পরিবহণ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া যায় না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ পরিস্থিতির তুলনায় যুক্তিসঙ্গত ও আনুপাতিক হওয়া প্রয়োজন।
শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপের পর ডিএমআরসি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে সংশোধন আনে। ৫৭টির বদলে ৪৫টি স্টেশনে প্রবেশ ও নির্গমন বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার, ১০ অক্টোবর, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার কথা। সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলিতে নিউ দিল্লি মেট্রো স্টেশন ছাড়া অন্যত্র আন্তঃলাইন যাত্রী বদলের সুবিধা চালু রাখার কথাও জানানো হয়েছিল।
কিন্তু আবেদনকারী ত্রিপাঠীর অভিযোগ, স্টেশনের সংখ্যা কমানো হলেও আদালতের নির্দেশের মূল বক্তব্য মানা হয়নি। তাঁর দাবি, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ তিনি জিটিবি নগর ও বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশনে গিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ দেখতে পান। জিটিবি নগর স্টেশনের কয়েকটি গেট বন্ধ ছিল এবং অন্য একটি গেট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ভাবে যাত্রীদের বেরোনোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনেও প্রবেশপথ বন্ধ থাকলেও বেরোনোর জন্য একটি গেট খোলা ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। জিটিবি নগর স্টেশনের একটি বন্ধ গেটের ভিডিয়োও তাঁর কাছে রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেল পরিষেবা বাতিল নিয়েও প্রশ্ন
শুধু মেট্রো নয়, রেল পরিষেবা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন আবেদনকারী। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভের আগে নিউ দিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করা হয়েছিল। রেল কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, বিক্ষোভ ঘিরে ওই স্টেশনগুলির আশপাশে যানজট ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু আবেদনকারীর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ট্রেন বাতিলের মতো পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
পরিবহণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা হলেও সাধারণ মানুষকে সেই বিষয়ে যথেষ্ট ও স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফলে যাঁরা কাজ, চিকিৎসা, পড়াশোনা কিংবা অন্য জরুরি প্রয়োজনে দিল্লিতে যাতায়াত করেন, তাঁদের দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি তাঁর। আবেদনে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের আদালতে ব্যক্তিগত ভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ারও আর্জি জানানো হয়েছে। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পদক্ষেপ করা হবে না, সেই প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গণপরিবহণের উপর থেকে ব্যাপক বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পরিষেবা চালু রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
‘সব কিছু বন্ধ করা যায় না’, বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট
শুক্রবার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য ছিল, কোনও সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে গিয়ে এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আদালত মনে করিয়ে দেয়, পরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া এবং পরিবহণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এক বিষয় নয়। নিরাপত্তার প্রয়োজন মেনে মেট্রো ও ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিলেন সেই সাধারণ মানুষ, যাঁরা প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকা থেকে রাজধানীতে আসেন। বৃহত্তর নয়ডা, দক্ষিণ দিল্লি এবং আশপাশের অঞ্চল থেকে বহু মানুষ জীবিকা, পড়াশোনা ও অন্যান্য জরুরি কাজে গণপরিবহণের উপর নির্ভরশীল। তাঁদের সকলকে একই ভাবে বিধিনিষেধের আওতায় ফেলা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্নও তুলেছিল বেঞ্চ।
কেন্দ্রের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে নিরাপত্তা বজায় রেখেও মেট্রো ও রেল পরিষেবা নিয়ন্ত্রিত ভাবে চালানো যায়। ডিএমআরসি, রেল কর্তৃপক্ষ এবং দিল্লি পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগকে চার দিনের মধ্যে নিজেদের পদক্ষেপের বিষয়ে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিল আদালত।
বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা, নাকি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি?
যন্তর মন্তরে কক্রোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র ডাকে শনিবারের বিক্ষোভের মূল দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য জমায়েত ও আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসন একাধিক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ করেছে। কিন্তু সেই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত কতটা ব্যাহত হচ্ছে, তা নিয়েই এখন আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
ত্রিপাঠীর দায়ের করা আবেদন সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করল। আদালতের নির্দেশের পরেও মেট্রোর প্রবেশপথ বন্ধ রাখা এবং রেল পরিষেবায় বিধিনিষেধ জারি থাকার অভিযোগের সত্যতা কতটা, তা খতিয়ে দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের উপরই এখন নজর।
বিক্ষোভের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ মানুষের চলাচল ও জরুরি পরিষেবায় প্রবেশের সুযোগও বজায় রাখতে হবে—সুপ্রিম কোর্টের শুক্রবারের পর্যবেক্ষণে এই ভারসাম্যের কথাই উঠে এসেছে। এখন দেখার, আদালত অবমাননার আবেদনটি কী ভাবে বিবেচনা করে শীর্ষ আদালত এবং দিল্লির গণপরিবহণে বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন কোনও নির্দেশ আসে কি না।
