হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির ঢাকেশ্বরী। রাজা বল্লাল সেন ১২শ শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রয়েছে- দুর্গাপুজোর স্থায়ী বেদী। প্রতিবছর ব্যাপক আয়োজনে এখানে দুর্গাপুজো হয়ে থাকে। যেহেতু জাতীয় মন্দির তাই ভক্ত সমাগত ঘটে ব্যাপকভাবে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অন্যতম বৈশিষ্ঠ হলো- শুধুমাত্র শারদীয় পাঁচদিনব্যাপী দুর্গোৎসবই নয়, প্রতি সপ্তাহে মঙ্গল,বুধ ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত ভক্তিভরে হয়ে থাকে দুর্গামায়ের অর্চনা। ভারত থেকে যেসব রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সফরে এসেছেন তাদের প্রত্যেকজনই একবার করে হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়েছেন।
আগমন ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দগণ দুর্গাপুজো দেখতে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে থাকেন। ঢাকেশ্বরী দুর্গাপুজো আয়োজনে ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অর্থই আসবে বিজ্ঞাপন ও অনুদান থেকে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে মহানগর সর্বজনীন পুজো কমিটি ও বাংলাদেশ পুজো উদযাপন পরিষদ। আয়োজকেরা জানান, এবার তাঁদের প্রতিপাদ্য ‘পরিবেশবান্ধব দুর্গাপুজো’। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুকুমার পাল দীর্ঘদিন ধরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের প্রতিমা তৈরি করে থাকেন। এবারও তিনি প্রতিমা তৈরি করছেন। দেড় মাস আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচে এই প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে।
মহানগর সর্বজনীন পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস। মহানগর সর্বজনীন পুজো কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, এবারের দুর্গাপুজোয় ঢাকেশ্বরীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসবেন। অষ্টমীতে প্রসাদ বিতরণের উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এবার প্রসাদ বিতরণ বেশি হবে, তাই বাজেট বেশি। আগের মতো এবারও প্রতিমা ও সাজসজ্জা থাকছে। আয়োজকেরা জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপুজোর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান দিয়েছেন ৫ লাখ টাকা। কিংবদন্তীগণ বলছেন, বল্লাল সেন একবার জঙ্গলে আচ্ছাদিত এক দেবীকে স্বপ্ন দেখেছিলেন। বল্লাল সেন সেখানে দেবীকে আবিষ্কার করেন এবং একটি মন্দির নির্মাণ করান, বিগ্রহটি ঢাকা ছিল বলেই দেবীর নামকরণ হয়েছে ঢাকেশ্বরী।
পক্ষান্তরে একথাও শোনা যায় যে, রানীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন যে, তিনি জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে আচ্ছাদিত হয়ে ঢাকা পড়ে আছেন–এই কথা রানী যেন রাজাকে জানান এবং সেই মন্দির উদ্ধার করে রাজা যেন অবশ্যই দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর এই স্বপ্নাদেশ পেয়েই রানী রাজাকে সব বৃত্তান্ত জানান। রাজা রানীর বর্ণনা শুনে একটি জঙ্গলের মধ্যে গাছপালায় ঢাকা শতাব্দী প্রাচীন ভগ্ন মন্দির দেখতে পান। যেহেতু মন্দির ঢাকা ছিল তাই নাম হয় ঢাকেশ্বরী। আবার কারও কারও মতে, ৮০০ বছর আগে মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বঙ্গদেশ জয় করলে, তিনি এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে একটি সোনাসহ অষ্টধাতুর মহিষমর্দিনী’র বিগ্রহ নির্মাণ করান। এই বিগ্রহটি নির্মাণ করেছিলেন জয়পুরের এক শিল্পী। সেই কারণেই বিগ্রহটির গঠনশৈলীর মধ্যে অনেকাংশেই রাজস্থানী শিল্প-ভাবনার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
বিশেষ করে দেবীর সিংহবাহনটির মধ্যে মরুভূমি অঞ্চলের শিল্পশৈলীর প্রকাশ ঘটেছে। মানসিংহ যে কেবলমাত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা নয় আজমগড় থেকে এক তেওয়ারি পরিবারকে এনে সেই মন্দিরের সেবায়েতও ঠিক করে দিয়েছিলেন। মন্দিরের ভেতরে খোলা জায়গায় পুজোর দিনগুলোতে দেশীয় পণ্যের মেলা বসে।
শনিপূজার মত সপ্তাহের প্রতিদিনই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পুজো-অর্চনা করা হয়। রবিবার বিকেলে কীর্তন, সোমবার শিবপুজো, মঙ্গল,বুধ ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টা থেকে ৯ টা পর্যন্ত হয় দূর্গামাতার অর্চনা এবং শুক্রবার সকাল ১০ টায় হয় মা সন্তোষীর পুজো। বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের কাছে বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় মন্দির হল রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দির। শোনা যায়, ঢাকার নামকরণ হয়েছে ‘ঢাকার ঈশ্বরী’ অর্থাৎ ঢাকা শহরের রক্ষাকর্ত্রী দেবীর নামের সূত্র ধরেই। ১৯৯৬ সালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকা শহরের পলাশী ব্যারাক এলাকায় অবস্থিত দেবী দুর্গার এই মন্দির। দেবীর ভক্তরা যতদিন এই মন্দিরে যাবেন, তিনি যেন ততদিনই বিরাজমান থাকবেন। মূল মন্দিরের চত্বরে রয়েছে একটি শিবমন্দির। সেখানে শ্বেত শিবলিঙ্গ রয়েছে। এ ছাড়াও এক জায়গায় পরপর চারটি শিব মন্দির।
অপর এক প্রবাদ অনুযায়ী দেবী সতীর দেহের ৫১টি খণ্ড যে সব জায়গায় পড়েছিল, সেগুলি পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী সতীর মুকুটের মণি ওই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জায়গায় পড়েছিল। তাই এটা উপপীঠ বলা হয়। এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে নানা কথা প্রচলিত আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সালে যখন দুই বাংলায় দাঙ্গা পরিস্থিতি ধারণ করে তখন কলকাতার হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট নিবাসী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী দেবী ঢাকেশ্বরীকে কলকাতায় নিয়ে যান। কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন রাজেন্দ্রকিশোর তিওয়ারি (মতান্তরে প্রহ্লাদকিশোর তিওয়ারি) এবং হরিহর চক্রবর্তী। ১৯৫০ সালে দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি অঞ্চলের দুর্গাচারণ স্ট্রিটে বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেটিই হলো কলকাতার শ্রীশ্রীঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির।





