শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, ধুনুচির ধোঁয়া আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ এই কয়েকটি অনুভূতিই বাঙালিকে বুঝিয়ে দেয়, মা আসছেন। দুর্গাপুজোর সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে ঢাকের বাদ্যি ছাড়া শারদোৎসব যেন অসম্পূর্ণ। কিন্তু কখনও কি খেয়াল করেছেন, ষষ্ঠীর বোধন, অষ্টমীর সন্ধিপুজো আর দশমীর বিসর্জনে ঢাকের আওয়াজ একরকম শোনায় না? প্রতিটি বোলের পিছনে কি রয়েছে আলাদা কোনও অর্থ, নাকি ছন্দের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় পুজোর আবেগ?
ঢাকের বোল কি সত্যিই কোনও বার্তা বহন করে?
ঢাকের প্রতিটি বোলের নির্দিষ্ট শব্দগত অর্থ রয়েছে, এমনটা বলা ঠিক হবে না। বরং ঢাকের বিভিন্ন ছন্দ, গতি ও বাদনরীতি নির্দিষ্ট আচার, পরিবেশ এবং আবেগের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও গুরু-পরম্পরায় শেখা ছন্দের মাধ্যমে পুজোর বিভিন্ন মুহূর্তকে সুরে প্রকাশ করেন। যেমন, দেবীর আরাধনার সময়ের গম্ভীর ছন্দ আর ধুনুচি নাচের সময়ের দ্রুত, উদ্দীপনাময় বাদনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই ছন্দের ভাষা লিখিত নিয়মের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্য ও মৌখিক শিক্ষার উপর। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ঢাকিরা একই আচারেও ভিন্ন ধরনের বোল ব্যবহার করতে পারেন।
বোধন থেকে বিসর্জন ছন্দে ছন্দে বদলে যায় আবহ
দুর্গাপুজোর প্রতিটি দিনেই ঢাকের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বোধনের সময় ঢাকের বাদ্যি পুজোর সূচনাকে আরও গম্ভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। সপ্তমীর আচার থেকে অষ্টমীর অঞ্জলি পুজোর বিভিন্ন মুহূর্তে ঢাকের ছন্দ ভক্তির আবহ তৈরি করে। আর সন্ধিপুজোর সময় ঢাকের আওয়াজ যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ পুজোতে ঢাকের বাদ্যি ধর্মীয় আবেগ ও উৎসবের উত্তেজনাকে একসূত্রে বেঁধে দেয়।
অন্যদিকে, ধুনুচি নাচের সময় ঢাকের দ্রুত ও ছন্দময় বাদন তৈরি করে এক অন্যরকম উন্মাদনা। ঢাকের তালে তালে যখন নাচেন ভক্তরা, তখন বাদ্যযন্ত্রটি আর শুধু পুজোর অনুষঙ্গ থাকে না; তা হয়ে ওঠে সম্মিলিত আনন্দের ভাষা। দশমীর বিসর্জনের সময় আবার ঢাকের ছন্দে মিশে থাকে আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বিষাদ। তবে এই সব ছন্দের কোনও একক, সর্বজনস্বীকৃত তালিকা নেই। পুজোর রীতি, ঢাকির নিজস্ব ঘরানা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে বাদনের ধরন বদলে যায়।
ঢাকের ইতিহাস: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকা এক শিল্প
ঢাকের ইতিহাস বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে ঢাকের উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে বা কোথায় হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় উৎসব, গ্রামীণ অনুষ্ঠান এবং লোকাচারে ঢাক ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে এটি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছে।
এই ঐতিহ্যের অন্যতম বাহক হলেন ঢাকিরা। বহু পরিবারে বাবা, দাদু বা পরিবারের অন্য প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম ঢাক বাজানো শেখে। কোন সময়ে কত জোরে বাজাতে হবে, কখন ছন্দ দ্রুত করতে হবে, কখন থামতে হবে এসব দক্ষতা বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে তৈরি হয়। গবেষণায় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের ঢাকি পরিবারের মধ্যে এই মৌখিক ও প্রজন্মান্তরে চলে আসা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।
ঢাকের আওয়াজে কেন জেগে ওঠে বাঙালির আবেগ?
ঢাকের শব্দের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিকও। ছোটবেলার পুজো, নতুন জামা, অঞ্জলির ফুল, ধুনুচি নাচ কিংবা বিসর্জনের শেষ মুহূর্ত অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঢাকের আওয়াজ। তাই ঢাক বাজতে শুরু করলেই অনেকের মনে জেগে ওঠে উৎসবের অনুভূতি। এই বাদ্যযন্ত্রের বিশেষত্ব এখানেই এর ছন্দ কোনও নির্দিষ্ট ভাষায় কথা না বলেও মানুষের মনে আনন্দ, ভক্তি, উত্তেজনা কিংবা বিষাদের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঢাকের প্রতিটি বোলের আলাদা অভিধানগত অর্থ না থাকলেও তার ছন্দের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। কোথাও তা পুজোর সূচনা ঘোষণা করে, কোথাও আরাধনার আবহ তৈরি করে, আবার কোথাও বিদায়ের মুহূর্তকে করে তোলে আবেগঘন। ঢাক তাই শুধু কাঠ, চামড়া আর কাঠির সমন্বয়ে তৈরি একটি বাদ্যযন্ত্র নয় এটি বাঙালির শারদোৎসবের জীবন্ত ঐতিহ্য, যার প্রতিটি ছন্দে মিশে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, সাধনা আর ভালোবাসা।
