নিউজ ডেস্ক: দুদিন আগেই বাংলা তথা গোটা ভারতে পালিত হয়েছে গণেশ চতুর্থী। কিন্তু গণেশের এক অন্য রূপ তুলে ধরেছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন ভাস্কর শিল্পী। ঐতিহ্য ও আধুনিকতা মিশিয়ে ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পকে যাঁরা আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম প্রদোষ দাশগুপ্ত। ১৯৪০ দশকের 'ক্যালকাটা গ্রুপ'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এই শিল্পী। তিনি ভাস্কর্যে নান্দনিকতার বাইরে বেরিয়ে সমসাময়িক সমাজ ও মানুষের যন্ত্রণাকে মাটি আর ব্রোঞ্জের ছাঁচে ফেলে দেখাতে চেয়েছিলেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। তাঁর এই সামাজিক চেতনার এক অনন্য ও রুগ্ন প্রকাশ ঘটেছে আমাদের অতি পরিচিত দেবতা গণেশের একটি ব্যতিক্রমী অবয়বে।
পৌরাণিক ও সনাতন সংস্কৃতিতে গণেশকে সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য, জ্ঞান ও বুদ্ধির দেবতা রূপে পুজো করা হয়। তাঁর ভুঁড়ি বা বিশাল উদর মূলত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমৃদ্ধিকে ধারণ করে। কিন্তু শিল্পী প্রদোষ দাশগুপ্ত প্রচলিত এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর তৈরি গণেশ স্থূলকায় বা মেদবহুল নন, বরং অত্যন্ত কৃশ, রুগ্ন এবং কঙ্কালসার।
গণেশের এই জীর্ণ ও শীর্ণ রূপটি আসলে যেন সমাজ জুড়ে থাকা তীব্র অপুষ্টি, অনাহার এবং দারিদ্র্যের আয়না।
তাঁর এই সৃষ্টির মূলে রয়েছে তৎকালীন বাংলার দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ এবং সাধারণ মানুষের খাদ্যের দারুন অভাব যা তাঁর
সংবেদনশীল মনে গভীরভাবে আলোড়ন ফেলেছিলো। দেবতাকে সমাজের সাধারণ নিগৃহীত ও অনাহারে থাকা মানুষের জায়গাদাঁড় করিয়ে তিনি এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও বাস্তবধর্মী বার্তা দিতে চেয়েছেন। দেবতা যেখানে নিজেই অপুষ্টির শিকার, সেখানে মানুষের জীবনের দৈন্যদশা কতটা ভয়াবহ, তা এই একটি মাত্র শিল্পকর্মের মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
ব্রোঞ্জ মাধ্যমে তৈরি এই ভাস্কর্যটিতে প্রদোষ দাশগুপ্তের সিগনেচার স্টাইল বা ফর্মের বলিষ্ঠ প্রকাশ দেখা যায়। জ্যামিতিক ভাঙচুর এবং ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও এর অন্তরাত্মাটি ছিল খাঁটি ভারতীয় ও সমকালীন সমাজ-সংলগ্ন। যেখানে তথাকথিত দেবত্বকে সরিয়ে রেখে ক্ষুধার্ত ও কঙ্কালসার মানুষের অবয়বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
প্রদোষ দাশগুপ্তের এই রুগ্ন গণেশ কেবল একটি ধর্মীয় মূর্তির শৈল্পিক রূপান্তর নয়, এটি মূলত একটি সামাজিক দলিল। ধর্মের মোড়কে সমাজবাস্তবতা এবং অনাহারের বিরুদ্ধে শিল্পীর এই নীরব প্রতিবাদ আজও ভারতীয় আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ধর্মতলায় রাজভবনের দক্ষিণ-পূর্বে স্থাপিত নেতাজীর মূর্তি তার নির্মিত। কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে প্রতিষ্ঠিত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পূর্ণাবয়ব শ্বেতপাথরের মূর্তিটিও তার গড়া।