আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তে ফের বড় মোড়। এ বার ওড়িশা থেকে গ্রেফতার করা হল পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে। ২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর তাঁর দেহ দ্রুত সৎকার করে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের উপর ‘চাপ’ সৃষ্টি এবং প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল নির্মল-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ থানায় নতুন করে এফআইআর দায়ের হওয়ার পরই এই গ্রেফতার বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
ঘটনার প্রায় দু’বছর পর নতুন এফআইআর এবং তার ভিত্তিতে প্রাক্তন বিধায়কের গ্রেফতারি স্বাভাবিক ভাবেই আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এত দিন মূল ধর্ষণ-খুনের তদন্তের পাশাপাশি হাসপাতালের প্রশাসনিক ভূমিকা, তথ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগ এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে তদন্ত চলছিল। এ বার তদন্তকারীদের নজরে এসেছে মৃত্যুর পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে শেষকৃত্য পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়া।
বাবার অভিযোগেই নতুন মামলা
মৃত চিকিৎসকের বাবা সোমবার খড়দহ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। অভিযোগে নির্মল ঘোষ ছাড়াও তৃণমূল নেতা সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে মেয়ের দেহ দ্রুত সৎকার করার সিদ্ধান্ত এবং সেই সময় তাঁদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল, সেই প্রশ্ন।
পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা মেয়ের দেহ নিয়ে আরও কিছু আইনি ও চিকিৎসাগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও দ্রুত শেষকৃত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের দাবি নিয়েও পরিবারের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সৎকারের বিষয়টি?
আরজি কর-কাণ্ডে ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট সকাল থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি ছিল—মৃত চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের পর কী ভাবে ঘটনাস্থল সামলানো হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
ধর্ষণ ও খুনের মতো মামলায় দেহ, পোশাক, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, নমুনা এবং অন্যান্য ফরেনসিক উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাড়াহুড়ো করে দেহ সৎকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, পরিবারের সম্মতি কী ভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই সময়ে কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব প্রশ্ন এখন নতুন তদন্তের কেন্দ্রে।
নতুন এফআইআর সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি সরাসরি মূল অপরাধের ঘটনাস্থলের বাইরে, ঘটনার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে তদন্তের নজর ঘুরিয়ে দিয়েছে।
সিবিআইও ফের সক্রিয়
এর মধ্যেই আরজি কর মামলায় সিবিআই তদন্তও নতুন করে গতি পেয়েছে। ঘটনার রাতে হাসপাতালে থাকা চিকিৎসক ও কর্মীদের ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা নতুন করে খতিয়ে দেখছেন—সেমিনার রুমে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের আগে ও পরে কে কোথায় ছিলেন, কখন কে বিষয়টি জানতে পারেন এবং কার সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল।
এক মহিলা কর্মীর মোবাইল ফোনও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে খবর। পরিবারের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওই ফোনের ভূমিকা ছিল কি না, সেই তথ্যও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। অর্থাৎ পুরনো তদন্তের তথ্য, নতুন জবানবন্দি, মোবাইলের তথ্য এবং পরিবারের নতুন অভিযোগ—সবকিছুকে মিলিয়ে একটি নতুন টাইমলাইন তৈরির চেষ্টা চলছে।
নির্মল ঘোষের রাজনৈতিক পরিচয়ও তাৎপর্যপূর্ণ
নির্মল ঘোষ দীর্ঘদিন পানিহাটি এলাকার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। ফলে তাঁর গ্রেফতারির রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়।
আরজি কর-কাণ্ডের শুরু থেকেই ‘প্রভাবশালী মহল’ তদন্তকে প্রভাবিত করেছিল কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতর হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, প্রথম দিকে তদন্তে নানা অসঙ্গতি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়নি। তৃণমূল শিবির অবশ্য সেই অভিযোগ বার বার অস্বীকার করেছে। এ বার সেই মামলাতেই প্রাক্তন বিধায়কের গ্রেফতারি নতুন করে সেই রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে নিয়ে এল।
তদন্তের সামনে এখন একাধিক প্রশ্ন
নির্মল ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা ঠিক কী জানতে চান, সেটিই এখন নজরে। বিশেষ করে—
- কে দ্রুত সৎকারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
- পরিবারের আপত্তি বা অনুরোধ কী ছিল?
- শেষকৃত্যের আগে পরিবারের সঙ্গে কারা কথা বলেছিলেন?
- নির্মল ঘোষের ভূমিকা ঠিক কী ছিল?
- দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের দাবি উঠেছিল কি না এবং উঠলে তা কী ভাবে বিবেচিত হয়েছিল?
- দেহ সৎকারের সিদ্ধান্তে কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ছিল কি না?
- ওই সময় উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল?
- এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন মামলার পরবর্তী গতিপথ।
আরজি কর-কাণ্ডের মূল ধর্ষণ ও খুনের বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি এই নতুন অভিযোগ তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ তদন্তের পরিধি এখন শুধু ‘কে খুন করল’ প্রশ্নে আটকে নেই; বরং তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি কঠিন প্রশ্ন—‘খুনের পর কী ঘটেছিল, এবং সেই ঘটনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল?’
প্রায় দু’বছর পর নির্মল ঘোষের গ্রেফতারি সেই প্রশ্নগুলিকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তে নতুন এই পর্বে এখন নজর থাকবে—জেরায় কী তথ্য উঠে আসে, আরও কারও নাম সামনে আসে কি না এবং অভিযোগের পক্ষে তদন্তকারীরা কী ধরনের প্রমাণ পান।