কলকাতা: ‘‘গুজরাতের পর দ্বিতীয় কর্মভূমি পশ্চিমবঙ্গ।’’ নিউ টাউনে দাঁড়িয়ে বাংলার মাটিকে প্রণাম করে এ ভাবেই রাজ্যে আগামী দিনের বড় বিনিয়োগের বার্তা দিলেন আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামো-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানালেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিউ টাউনে প্রস্তাবিত ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এর ভূমিপুজো ও শিলান্যাস অনুষ্ঠানে এসে বাংলাকে তাঁর ‘দ্বিতীয় কর্মভূমি’ হিসাবে তুলে ধরেন আদানি।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২০০০ শয্যার হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং গবেষণাকেন্দ্র তৈরি হবে বলে জানান তিনি। প্রায় ৫২ একর জমির উপর গড়ে উঠতে চলা এই প্রকল্পকে শুধুমাত্র হাসপাতাল নয়, ‘মেডিসিটি’ হিসাবেই তুলে ধরেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল জানিয়েছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নিউ টাউনে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দেন গৌতম আদানি। তার পর শিলান্যাসের মঞ্চে উঠে বাংলাতেই বক্তব্য শুরু করেন তিনি। ‘‘নমস্কার, কলকাতাকে আমার প্রণাম, বাংলার মাটিকে আমার প্রণাম’’—এই সম্ভাষণের পর বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মনীষীদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন আদানি। তাঁর বক্তব্যে বার বার উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বও।
আদানির বক্তব্য, এক দিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার পশ্চিমবঙ্গ, অন্য দিকে সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে সামনে রেখেই রাজ্যে ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন থেকে শুরু করে রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে আদানি গোষ্ঠী।
নিজের শিল্পজীবনের সঙ্গে বাংলার সম্ভাবনার তুলনাও টানেন আদানি। তাঁর কথায়, ‘‘গুজরাতে মুন্দ্রা বন্দর ছিল আমার প্রথম কর্মভূমি। এ বার বাংলা আমার দ্বিতীয় কর্মভূমি।’’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে আরও সম্ভাবনা তৈরি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে দিনের সবচেয়ে বড় ঘোষণা ছিল স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এ ২০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি হবে। আদানি জানান, প্রকল্পটি ‘নন-প্রফিট’ মডেলে পরিচালিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালের ১০০০ শয্যা অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে বলে জানান তিনি। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের মাধ্যমে ওই রোগীরা চিকিৎসার সুযোগ পাবেন বলেও ঘোষণা করা হয়।
শুধু চিকিৎসা নয়, একই চত্বরে তৈরি হবে মেডিক্যাল কলেজ ও গবেষণাকেন্দ্র। বিশ্বমানের চিকিৎসা পরিকাঠামোর পাশাপাশি চিকিৎসক তৈরি এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে দাবি আদানি গোষ্ঠীর। প্রকল্প ঘিরে সরাসরি অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন গৌতম আদানি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গৌতমের স্ত্রী প্রীতি আদানি এবং পুত্র করণ আদানি। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের উপস্থিতির জন্যও ধন্যবাদ জানান। আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের একটি সমঝোতাও হয়েছে ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে। মহাকরণ এবং কুমারটুলি ঘাটের হেরিটেজ কাঠামো পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
শুধু পরিকাঠামো বা স্বাস্থ্য নয়, বাংলার সংস্কৃতিকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পরিকল্পনার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্গোৎসবকে বিশ্বের আরও বড় মঞ্চে পৌঁছে দিতে আদানি গোষ্ঠী সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পকে শুধু একটি হাসপাতাল হিসাবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর কথায়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মেডিসিটি’। রাজ্যের ইতিহাসে বৃহস্পতিবারের দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি। বাংলার পুনর্গঠনে আদানি গোষ্ঠীর সহযোগিতা চেয়ে শিল্পগোষ্ঠীকে রাজ্যে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।
আর আদানি? বক্তব্যের শেষেও বাংলাকেই সামনে রাখলেন। আগামী দিনে আরও বিনিয়োগের বার্তা দিয়ে বাংলাতেই নিজের বক্তব্য শেষ করলেন শিল্পপতি। ২০৩৫-এর মধ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগের সেই বার্তা বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, এখন নজর সেদিকেই।
