গাজা: একটা বাড়ি ছিল। একটা ঘর ছিল। ছিল নিজের বিছানা, বই, কম্পিউটার, জামাকাপড়, ছোটবেলার খেলনা। ছিল প্রতিবেশীদের চেনা মুখ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কাজের ব্যস্ততা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন। এখন সেই তালিকায় একে একে কেবল অতীত যোগ হচ্ছে। কোথাও বাড়ির জায়গায় ধ্বংসস্তূপ, কোথাও পরিচিত রাস্তার জায়গায় কংক্রিটের স্তূপ। আর যাঁরা বেঁচে রয়েছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই যুদ্ধ মানে শুধু প্রাণে বেঁচে থাকা নয়—নিজের পুরনো পরিচয়টাকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলা।
৭ অক্টোবর। তিন বছর আগে যে সকালটা আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বদলে যায় ভয়াবহ অনিশ্চয়তায়। গাজা সিটির বাসিন্দা ওমর আলদালু তখন বাড়িতে। কাজের জন্য বেরোনোর আগে সকালের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ শুরু হয় বিস্ফোরণ, রকেটের শব্দ, চিৎকার। প্রথম কয়েক মুহূর্তে তিনি এবং তাঁর পরিবারের কেউই বুঝতে পারেননি, সামনে ঠিক কী অপেক্ষা করছে।
৩১ বছরের ওমর পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। একটি উপসাগরীয় সংস্থায় কাজ করতেন। কম্পিউটারের সামনে বসে কোড লেখা, কাজ শেখা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—যুদ্ধের আগে তাঁর জীবন ছিল অন্য রকম। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই পরিচিত পৃথিবীটাই যেন অচেনা হয়ে যায়।
প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, হয়তো পরিস্থিতি সাময়িক। কিন্তু গোলাবর্ষণ বাড়তে থাকায় সেই বিশ্বাসও ভেঙে যায়। তাঁর আশপাশের এলাকা আক্রান্ত হয়। বিদ্যুৎ চলে যায়, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরিবারটি। কোথায় নিরাপদ জায়গা, কোথায় যাওয়া উচিত, পরের কয়েক ঘণ্টায় কী হবে—কোনও প্রশ্নেরই উত্তর ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তেই হয়। সঙ্গে নেওয়ার মতো জিনিসের তালিকা করার সময়ও ছিল না। কয়েকটি গ্রীষ্মের পোশাক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ওমর। ল্যাপটপ, বই, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—প্রায় সবই পড়ে রইল ঘরে। কারণ তখনও তাঁর ধারণা ছিল, এক-দু’দিনের মধ্যেই হয়তো ফিরে আসবেন। ফিরে যাওয়া আর হয়নি।
যে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলেন, সেটিই হয়ে গেল স্মৃতি। বেরোনোর আগে বাড়ি ও নিজের ঘরের ছবি তুলে রেখেছিলেন ওমর। কারণ তিনি জানতেন না, আবার কখনও সেখানে দাঁড়াতে পারবেন কি না। এর আগেও ২০১৪ সালের যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। কিন্তু আগের সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরের তিন বছরের বাস্তবতার যেন কোনও তুলনাই চলে না। কারণ এ বার শুধু বাড়ি হারানো নয়। হারিয়ে যেতে থাকে জীবনের একের পর এক স্তর।
কাজ চলে যায়। নিয়মিত বিদ্যুৎ নেই। ইন্টারনেট নেই। পানীয় জলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে ওঠে। কখনও কখনও দু’-তিন দিন প্রায় না খেয়েই কাটাতে হয়েছে। বাজারে খাবার থাকলেও অনেক সময় তা কেনার ক্ষমতা ছিল না পরিবারের। কিন্তু ওমরের কাছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্ভবত অন্য জায়গায়।
যুদ্ধের আগে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত এক তরুণ। কাজ করতে ভালবাসতেন, নতুন কিছু শিখতেন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় সময় কাটাতেন। তিন বছরের ভয়, অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি আর ক্রমাগত ক্ষতি তাঁকে বদলে দিয়েছে। তাঁর নিজের কথায়, যুদ্ধের মধ্যে যেন তাঁর ভিতর থেকে আর এক জন মানুষ তৈরি হয়েছে—যে মানুষটি আগের ওমরের মতো নয়।
গাজায় এই গল্প শুধু ওমরের নয়। আসিলের পরিবারের গল্পেও রয়েছে একই ক্ষয়ের ছাপ। বাড়ি হারিয়েছে পরিবারটি। হারিয়েছে চাকরি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে বাড়িতে জীবন কেটেছে, সেখান থেকে বার বার পালাতে হয়েছে। পাঁচ বারেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে পরিবারটি। সঙ্গে হারিয়েছে আত্মীয়স্বজন। পরিবারের ২৫ জনেরও বেশি সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর একমাত্র কাকা এবং তাঁর পুরো পরিবার।
কাকার পরিবারের সদস্যদের হারানোর যন্ত্রণা এখনও তাঁকে তাড়া করে। তাঁদের শেষ বার দেখার সুযোগ হয়নি। নিরাপত্তার কারণে শেষ বিদায় জানানোও সম্ভব হয়নি।
একটা সময় নিজের ঘরের প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে যে স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেগুলিও হারিয়ে যায়। ছোটবেলার খেলনা, পুরনো পোশাক, ছবি, প্রসাধনীর সামগ্রী, বিছানা, ডায়েরি—জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত জমিয়ে রাখা জিনিসগুলি সবই থেকে যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িতে। এমনকি ভবিষ্যতে নিজের মেয়েকে দেওয়ার কথা ভেবে রেখে দেওয়া কিছু জিনিসও আর নেই।
তিন বছর ধরে তাই ক্ষতির হিসাব করতে গেলে শুধু মৃতের সংখ্যা দিয়ে গাজার বাস্তবতা বোঝা যায় না। প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি বাড়ি, একটি পরিবার, একটি চাকরি, একটি বন্ধুত্ব, একটি শৈশব, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন।
যুদ্ধের অভিঘাত শরীরের বাইরেও পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা—সবই জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। অল্প বয়সেই চুল পেকে যাচ্ছে, বার বার উদ্বেগের আক্রমণ হচ্ছে, প্রতিটি দিন কাটছে পরের মুহূর্তে কী হবে সেই আশঙ্কায়।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তাই—এর পরে কী? যদি এক দিন গোলাগুলি থামে, মানুষ কোথায় ফিরবে? যে বাড়ি ছিল সেটি যদি আর না থাকে, পরিচিত রাস্তা যদি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, কাজের জায়গা যদি হারিয়ে যায়, স্কুল-কলেজ বা হাসপাতাল যদি আর আগের জায়গায় না থাকে, তা হলে ‘ফিরে যাওয়া’ বলতে আসলে কী বোঝাবে?
গাজার এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সহজ নয়। সাম্প্রতিক উপগ্রহ-চিত্র এবং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও ধ্বংসের ব্যাপকতা স্পষ্ট। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত জিনিস, নিখোঁজদের দেহাবশেষ এবং বিস্ফোরিত না হওয়া অস্ত্রের ঝুঁকি। পুনর্গঠন তাই শুধু বাড়ি বানানোর কাজ নয়; তার আগে ধ্বংসস্তূপ সরানো, অবকাঠামো ফিরিয়ে আনা, জল ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং মানুষের নিরাপদে ফেরার পরিবেশ তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তবু এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। কেউ জল খুঁজছেন, কেউ খাবার, কেউ কাজ। কেউ নিজের পুরনো জীবনের কোনও একটি টুকরো আঁকড়ে ধরে আছেন। কেউ শুধু চাইছেন, তাঁর পরিচয় যেন কোনও পরিসংখ্যানের অঙ্কে হারিয়ে না যায়।
কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দিক হয়তো এটাই—মানুষকে শেষ পর্যন্ত একটি সংখ্যায় পরিণত করে ফেলা। কত জন নিহত, কত জন আহত, কত বাড়ি ধ্বংস, কত জন বাস্তুচ্যুত—সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই সংখ্যার ভিতরে যে মানুষটি ছিলেন, তাঁর গল্পটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
ওমরদের গল্প সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির পরিচয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। তিন বছর পরেও তাঁদের কাছে গাজা শুধু যুদ্ধের মানচিত্র নয়। সেখানে এখনও পড়ে আছে তাঁদের শৈশব, তাঁদের বাড়ি, তাঁদের কাজ, তাঁদের প্রিয় মানুষ, তাঁদের স্মৃতি।
ধ্বংসস্তূপের নীচে তাই শুধু কংক্রিট চাপা পড়ে নেই। চাপা পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের পুরনো জীবন। আর বেঁচে থাকা মানুষগুলির সামনে সবচেয়ে বড় লড়াই—শুধু নতুন করে ঘর বানানো নয়, সেই ঘরের মধ্যে আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনটাকেও খুঁজে পাওয়া।
