স্পোর্টস ডেস্ক: দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় গুজরাত টাইটান্সের অনুশীলন। ঘুম ভেঙে যে খবরের মুখোমুখি হবেন, তা স্বপ্নেও ভাবেননি গুরনুর ব্রার। ভারতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন এত দিন তাড়া করে বেড়িয়েছেন। এবার সেই স্বপ্নপূরণের দরজায় দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবের ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী পেসার। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্ট এবং তিন ম্যাচের একদিনের সিরিজের ভারতীয় দলে জায়গা পেয়েছেন তিনি। জীবনের প্রথম জাতীয় দলে ডাক। তাও আবার দুই ধরনের ক্রিকেটেই।
২০২৬ সালের আইপিএলে গুজরাত টাইটান্সের হয়ে খেলছিলেন গুরনুর। দলের শেষ লিগ ম্যাচের দু’দিন আগে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেই সময়ই ঘোষণা হয়ে যায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় দল। ঘুম থেকে উঠে পরিবারের কাছ থেকেই প্রথম সুখবরটি পান ২৬ বছরে পা দিতে চলা এই পেসার। তার পর গুজরাত শিবিরের সতীর্থরাও তাঁকে অভিনন্দন জানান। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৮টি ম্যাচে ৫২ উইকেট রয়েছে তাঁর। গড় ২৭.৩, স্ট্রাইক রেট ৪৫.৩। সংখ্যাগুলি যথেষ্ট ভাল হলেও জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পিছনে বড় ভূমিকা তাঁর শারীরিক গঠন, গতি এবং বোলিংয়ের বিশেষ দক্ষতার।
গুরনুরের উচ্চতা ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চি। ভারতীয় পেসারদের মধ্যে এমন উচ্চতা খুব বেশি দেখা যায় না। তাঁর বাবা একসময় জাতীয় স্তরে বাস্কেটবল খেলেছেন। ছোট ভাই ভারনুরও ক্রিকেটার, বয়স মাত্র ১৬ হলেও উচ্চতায় দাদার কাছাকাছি। তবে ক্রিকেটে গুরনুরের পথচলা শুরু হয়েছিল বেশ দেরিতে। ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত পাড়ার টেনিস বলের ক্রিকেটেই মজে ছিলেন তিনি। মহালির রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই গতি বোলিংয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। স্পিন করতে চাইতেন না। তাঁর ভাবনা ছিল, জোরে বল না করলে ব্যাটাররা ছক্কা মারবে!
পরিবারের উৎসাহে চ্যাম্পিয়ন্স ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। কোচ রবি ভার্মার কাছে তিন বছর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর গতি বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু করেন বরিন্দর সিংয়ের সঙ্গে। লঞ্চিং প্যাড ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময় ১৯ বছর বয়সেই ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার গতিতে বল করতেন গুরনুর। শক্তি ও পেশির গঠন নিয়ে কাজ করে তাঁর গতি আরও ১০ কিলোমিটার বাড়ান কোচ। পাশাপাশি বোলিংয়ের ভঙ্গি, শরীরের ভারসাম্য এবং সুইং নিয়েও চলে নিবিড় অনুশীলন।
তবে তাঁর ক্রিকেটজীবনে ধাক্কাও কম আসেনি। ২০২১-২২ মরশুমে বিজয় হাজারে ট্রফিতে পাঞ্জাবের হয়ে সিনিয়র ক্রিকেটে অভিষেক। পরের মরশুমে রনজি ট্রফিতে রেলওয়েজের বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচেই ১৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে নজর কাড়েন। ২০২৩ সালে পঞ্জাব কিংসের হয়ে আইপিএলে সুযোগ পেলেও লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে একমাত্র ম্যাচে তিন ওভারে ৪২ রান দেন। তার পর আর সুযোগ মেলেনি। একই বছরে পিঠে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হওয়ায় ২০২৩-২৪ মরশুমের ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও ছিটকে যান।
সেই চোট কাটিয়ে ফেরার লড়াই ছিল কঠিন। কোচ বরিন্দরের পরামর্শে এক মাস ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে বল করে শুধু বোলিংয়ের ভঙ্গি ও সুইংয়ের উপর জোর দেন। ধীরে ধীরে গতি ফেরে। ২০২৪ সালে শের-ই-পাঞ্জাব টি-টোয়েন্টি কাপে ২২ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন। ২০২৪-২৫ রনজি মরশুমে সাত ম্যাচে ২৬ উইকেট, গড় ২০.৩। পাশাপাশি ভারতীয় দলের অনুশীলন শিবিরে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মাদের বল করার অভিজ্ঞতাও হয় তাঁর।
২০২৪ সালের নভেম্বরের আইপিএল নিলামে ১.৩ কোটি টাকায় গুরনুরকে দলে নেয় গুজরাত। ২০২৫ সালে ভারতীয় ‘এ’ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া ‘এ’-র বিরুদ্ধে দুই ম্যাচে আট উইকেট নেন। গুজরাতের শক্তিশালী পেস আক্রমণে নিয়মিত খেলার সুযোগ না পেলেও মহম্মদ সিরাজ, কাগিসো রাবাডা এবং কোচ আশিস নেহরার কাছ থেকে শিখেছেন অনেক কিছু। এবার জাতীয় দলের দরজা খুলল। গুরনুরের কথায়, ভারতের হয়ে খেলার স্বপ্নই তাঁকে এত দূর এনেছে। দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর সুযোগ পেলে গর্বের সঙ্গে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চান তিনি।




